সাত দশকের ঐতিহ্য, ফুলবাড়ীর বউ মেলায় নারীদের একচ্ছত্র অধিকার
পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ, নারীদের অবাধ বিচরণ—এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনেই দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বসেছে প্রায় সাত দশকের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’। কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ আর আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগে মেলাটি হয়ে উঠেছে স্থানীয় নারীদের মিলনমেলা। সময়ের পরিবর্তনে জীবনযাত্রার ধরন বদলালেও ঐতিহ্যের টানে প্রতিবছর এ মেলায় ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সী নারী।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) লক্ষ্মীপূজার পরদিন ফুলবাড়ী পৌর এলাকার সুজাপুর গ্রামের সর্বজনীন দুর্গামন্দির চত্বরে দিনব্যাপী বসে এ মেলা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারীদের পদচারণায় মুখর ছিল মেলাপ্রাঙ্গণ। নারীদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকলেও মেলার বিভিন্ন দোকান পরিচালনা করেন পুরুষ বিক্রেতারা।
মেলায় প্রসাধনসামগ্রী, শিশুদের খেলনা, হস্তশিল্প, গৃহসজ্জার উপকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। শতাধিক দোকানে চলে কেনাবেচা। তবে শুধু কেনাকাটাই নয়, পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করা, গল্প করা এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও মেলার অন্যতম আকর্ষণ। নারীরা নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়াতে ও কেনাকাটা করতে পারেন বলেই মেলাটির প্রতি তাঁদের আগ্রহ বেশি।
মেলায় আসা সুজাপুর গ্রামের প্রিয়া রানী ও সোমা রানী দাস বলেন, ‘মেলায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। কেনাকাটার পাশাপাশি সবার সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দটাই আলাদা।’ তাঁদের মতো অনেক নারীর কাছে বউ মেলা কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক ও আনন্দ ভাগাভাগিরও উপলক্ষ।
আয়োজন কমিটির সদস্য পাপন সরকার জানান, নারীরা যেন নির্বিঘ্নে মেলা উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য প্রবেশপথে নজরদারি রাখা হয়। সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অশেষ রঞ্জন দাস ও সাধারণ সম্পাদক সুজন সরকার জানান, প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পরদিন এ মেলার আয়োজন করা হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন জমিদার ক্ষিতীশ চন্দ্র রায়ের আমলে মেলার সূচনা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে মন্দির পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে মেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গৃহবধূসহ বিভিন্ন বয়সী নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় এটি ‘বউ মেলা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
মেলার নিরাপত্তা বিষয়ে ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে মেলা সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। তাই এ বিষয়ে তিনি অবগত নন।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ফুলবাড়ীর বউ মেলা স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের একটি স্বতন্ত্র আয়োজন। নারীদের জন্য আলাদা পরিসর তৈরি করে দেওয়া এ মেলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আনন্দ, সম্পর্ক ও ঐতিহ্যের বন্ধন ধরে রেখেছে।