ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পাঁচ মাস থেকে বন্ধ সিজারিয়ান অপারেশন

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা):
প্রতি মাসে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০ থেকে ৩৫ জন গর্ভবতী মায়ের সিজারিয়ান অপারেশন হতো। অপেক্ষাকৃত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রসূতি মায়েরা সহজেই এখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে সিজারিয়ান অপারেশন করার সুযোগ পেতেন কিন্তু গাইনী কনসালটেন্ট ও এনেসথেসিয়ার চিকিৎসক না থাকার কারণে গত ৫ মাস ধরে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ কারণে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিদিন ফিরে যাচ্ছেন গর্ভবতী মায়েরা। সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
কর্তৃপক্ষ জানান, গেল আগস্ট মাসেই ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন রোগের অপারেশন হয়েছে ৮৩ জন রোগীর। এখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের রোগীকে অপারেশন করা হলেও গাইনী কনসালটেন্ট ও এনেসথেসিয়ার চিকিৎসক না থাকার কারণে গত ৫ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশন কার্যক্রম। এখানে আইসিইউ বা মুমুর্ষ রোগীকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। এর বাইরে ঈশ্বরদীর ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটের কারণে সাধারণ চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যহত হচ্ছে চরম ভাবে।
সরেজমিন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে জানা গেছে, এখানে জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ রয়েছে ১১টি যার ১০টিই শুন্য। কাগজে কলমে ৩ জন দেখানো হলেও ১ জন অর্থ সার্জন পাবনা সদরে ও গাইনি কনসালটেন্ট রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্ত হয়ে রাজশাহীতে কর্মরত রয়েছেন। ২ জনকেই অন্যত্র পদায়ন করার ফলে ১১ জনের স্থলে মাত্র ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মেডিকেল অফিসার পদ রয়েছে ১৪টি, যার ৬টি পদই শুন্য। আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদ শুন্য রয়েছে গত প্রায় দেড় বছর। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি পদ ১৯টি অথচ এখানে ৮টি পদ শুন্য বছরের পর বছর ধরে। ৫ বছর ধরে বাবুর্চি পদ শুন্য থাকায় একজন সহকারী বাবুর্চি একাই প্রতিদিন ৫০ জন রোগীর তিন বেলা খাবার রান্না করে থাকেন। ধাত্রী বা মিডওয়াইফ পদের ৪ জনের স্থলে ২ জন থাকলেও তারা নিয়মিত কাজ করেন না। পরিচ্ছন্নতা কর্মী না থাকার কারনে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দৃশ্যমান। স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন পৌরসভা থেকে অথবা বাইরে থেকে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ভাড়ায় এনে কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। ২ জন আয়ার মধ্যে ১জন এবং ৩জন ওয়ার্ড বয় এর স্থলে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের কষ্টের সীমা থাকে না। প্রতিদিন আউটডোরের প্রায় ৭ থেকে ৮শ’ রোগীদের সামাল দিতে হাজিরায় লোক এনে কাজ করানো হয়।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান বিভাগ সূত্র জানায়, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ টি শয্যা থাকলেও প্রতিদিন রোগী ভর্তি হয় গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন। ফলে সবসময় এখানে বারান্দা ও ফ্লোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে হয় বাড়তি রোগীদের। প্রতিদিন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধারণ বিভাগে গড়ে ৭শ’ থেকে ৮শ’ রোগী বহির্বিভাগে এবং জরুরী বিভাগে ২শ’ থেকে ৩শ’ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এতো সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দিতে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ৫ জন চিকিৎসক। তারা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে গলদঘর্ম হয়ে থাকেন প্রতিদিন। রোগীর ভিড় সামাল দিতে প্রায়ই এখানে চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের বাগ্বিতন্ডাসহ অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প ও ঈশ্বরদী ইপিজেডের হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারিরা ঈশ্বরদী এলাকায় বসবাস করার দরুন তাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রোগে অসুস্থ্য হয়ে প্রায়ই চিকিৎসা নিতে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন কিন্তু রোগ একটু জটিল হলেই চিকিৎসক সংকটের কারণে তাদের রাজশাহী কিংবা পাবনা সদরে রেফার্ড করে দেওয়া হয় বলে স্বীকার করেছেন ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। ব্যস্ততম এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুধুমাত্র টিবি রোগের এক্স-রে ছাড়া সাধারণ অন্য কোন রোগের এক্স-রে করার ব্যবস্থা নেই। আলট্রাসনোগ্রাফি করানোর ব্যবস্থাও রয়েছে সীমিত।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৯৭২ সালে স্থাপন করা জরজীর্ণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের দেওয়াল ও ছাদের পলেস্তার খসে পড়ছে, ছাদের পলেস্তরা খসে রোগীদের বিছানায় পড়া, বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়া নিত্য দিনের ঘটনা। সম্মেলন কক্ষের ছাদ ফেটে ঝরঝর করে পানি পড়ে অথচ এসব সংস্কার করা হয় না বছরের পর বছর।
এসব সকল সমস্যার কথা অকপটে স্বীকার করে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলী এহসান বলেন, আমার অফিস কক্ষের ছাদেও পলেস্তরা খসে পড়ে। বাধ্য হয়ে চেয়ার টেবিল সরিয়ে নিতে হয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা নাজনীন আফরোজ বলেন, চলতি বছরের ৭ এপ্রিল থেকে গাইনি কনসালটেন্ট ডা. শামীমা আক্তার বানু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্ত হয়ে সেখানে কর্মরত রয়েছেন। এ কারনে এখানে প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদের চলতি দায়িত্বে থাকা ডা. সাহেদুল ইসলাম শিশির বলেন, একটি ব্যস্ততম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক সঙ্গে এত সংখ্যক চিকিৎসক সংকট থাকায় প্রতিদিন বহির্বিভাগ, আন্ত:বিভাগ, ভর্তি হওয়াসহ কমবেশি প্রায় ১ হাজার রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া দুরুহ হয়ে পড়েছে।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংস্কারের জন্য স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে চাহিদাপত্র এবং চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। মন্ত্রলালয় ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের অনুমোদন পেলে এসব সংকট লাঘব হবে।