রবিবার, মে ১০, ২০২৬

একাত্তরের ২৭ মার্চ-১৩ এপ্রিল রাজশাহী সেনানিবাস ছিল অবরুদ্ধ

মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী বরজাহান ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৬ অপরাহ্ন মতামত
মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী বরজাহান ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৬ অপরাহ্ন
একাত্তরের ২৭ মার্চ-১৩ এপ্রিল রাজশাহী সেনানিবাস ছিল অবরুদ্ধ

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ যুদ্ধের লড়াইয়ের দিনগুলো আজও নাড়া দেয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য, বাঙালিদের জন্য পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর ও বীরত্বের তা মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গৌরবান্বিত হয়ে আছে। একইভাবে স্বজন হারানোর ব্যথা-বোধ এবং শোক ও শক্তির উদ্বোধনও মুক্তিযুদ্ধ। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ৫৫ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো উদীপ্ত করে, উচ্ছ্বসিত করে তোলে, মহান করে তোলে।


১৯৭১ সালে আমি রাজশাহী সিটি কলেজের রাত্রিকালীন শাখার উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা ম্যান্ডেটের প্রতিফলন ঘটে। নির্বাচনে নৌকা মার্কা প্রতীকে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অপরদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পার্লামেন্ট গঠন করতে দেয়ং নি। শুরু হয় আলোচনার নামে কালক্ষেপণ।


এমনই কঠিন মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ প্রদান করলেন। তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে তিনি উদাত্তকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন- ‘এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’/ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো, কিন্তু এ দশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশআল্লাহ! জয় বাংলা।‘ আমরা ভাষণটি শুনেছিলাম ৮ মার্চ। ৭ মার্চ সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ রেডিও পাকিস্তান ও পাকিস্তান টিভিতে প্রচার করতে দেয় নি। শুরু হলো বাঙালির স্বাধীনতার লড়াই।


যার যা আছে তাই নিয়ে গণমানুষের লড়াই। ২৫ মার্চ কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে নেয়া হয়। শুরু হয় পাকিস্তানি বর্বর বাহিনির হতাযজ্ঞ। ওই রাতে পাকিস্তানি বাহিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্পে (বর্তমানে বিজিবি) আকস্মিক হামলা চালিয়ে বাঙালি সৈনিকদের হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণে ১০ হাজার ছাত্রছাত্রী শহীদ হন। আহতদের সংখ্যা বলা কঠিন। 


আমরা রাজশাহীতে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করি রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশ ভাইদের প্রতিরোধযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ২৭ মার্চের ওই যুদ্ধে রাজশাহী রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি মামুন মাহমুদ সাহেব ও এসপি শাহ আব্দুল মজিদ সাহেব পাকিস্তানি ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের হাতে শহীদ হন। আরো ৭২ জন বিভিন্ন পদের পুলিশ ভাই এই যুদ্ধে শহীদ হন। আমরা বেতার মারফত মেজর জিয়ার বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দেয়া স্বাধীনতা ঘোষণা শুনতে পাই। তখন আমরা ভেবেছিলাম বাঙালি সেনাবাহিনী আমাদের সঙ্গে আছেন। সর্বাত্মক লড়াই শুরু হয়ে গেল। পুলিশ লাইনে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর পাকিস্তানি ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আর ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আসতে পারেনি।


কারণ, প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাউন্টার অ্যাটাক চলছিলো। এরই মধ্যে মার্চ মাসের শুরুতে পাকিস্তানি ২৫ পঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল রাজা আজিজ বালুচ তার সেনাবাহিনি দিয়ে রাজশাহীর প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ এমএলএ নাজমুল হক সরকার, অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদীর বড় ভাই (৭০ এর নির্বাচিত এমপি) সিএন্ডবি-এর অফিসার আব্দুল হক, অ্যাডভোকেট বীরেন্দ্রনাথ সরকার, পৌরসভার চেয়ারম্যান  সুরেশ পান্ডে, রাজশাহীর প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের দুইপুত্র, এক ভাইসহ রানীবাজার মিয়াপাড়া নিবাসী তৎকালীন ছাত্রনেতা সিদ্দিক হোসেনকে ধরে নিয়ে যায় এবং তারা আর ফিওে আসেনি।


এরই মধ্যে ২৮ মার্চ নওগাঁ থেকে তৎকালীন মেজর গিয়াস উদ্দিন চারঘাট আলাইপুর ক্যাম্প থেকে সুবেদার মেজর শিরাজ উদ্দিন লস্কর এবং তার ১২ জন ইপিআর সদস্য নিয়ে আমাদের সঙ্গে বালিয়াপুকুর আমবাগান এলাকায় জনাব একরাম আলী ও তার ভাই হাজী আহম্মদ আলীর বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সুবেদার কাসেম তার কয়েকজন সদস্য নিয়ে এই প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট চতুর্দিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে যতদূর মনে পড়ে, বিবিসি‘র প্রখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালি ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে রাজশাহীর মুক্ত অঞ্চলের খবর সংগ্রহ করেন এবং তা প্রচার করেন। প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মাহতাব উদ্দিন ও শফিকুর রহমান রাজা বিবিসির ওই সাংবাদিককে নিয়ে যাওয়া-আসা করেন। 


এই প্রতিরোধ যুদ্ধ চলাকালেই ১২ এপ্রিল পুঠিয়া বিড়ালদহে লোহার পুল এলাকায় ঢাকা থেকে আসা হানাদার পাকিস্তানি বাহিনির সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনি পিছু হটে পুঠিয়া থানা এলাকার পুঠিয়া রাজবাড়ী ও আশেপাশে অবস্থান নেয়। পরদিন ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনি অবরোধ ভেঙে মার্চ-আপ করে। এরপর বেলপুকুর রেলগেটে পাকিস্তান বাহিনি আবারও প্রতিরোধের মুখে পড়ে। কিন্তু ভারি অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধাগণ টিকতে না পেরে পদ্মা নদী পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এই সব প্রতিরোধ যুদ্ধে আমার মনে পড়ে ৭২ জন মুক্তিকামী মুক্তিসেনা শাহাদাতবরণ করেন। আমরা ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যাতে রাজশাহীর প্রতিরোধ যুদ্ধ সমাপ্ত করে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই।


আমি নিজে মালদহ শহরে পোড়াটুলি ইংরেজ বাজার এলাকায় একটি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে পরবর্তীতে মাউনটেন ব্রিগেডের হেডকোয়ার্টার তেজপুর ক্যান্টনমেন্টে ট্রেনিং গ্রহণ করে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কোনো না কোনো এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা বাহিনি হানাদার পাকিস্তানি বাহিনি এবং তাদের এ দেশীয় সশস্ত্র রাজাকার. আলবদর, আলশামস বাহিনি এবং  শান্তি কমিটি ও মুসলিম লীগ সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।


ভারত সরকার ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে।  এরপর চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয়। ১৬ ডিসেম্বওর মহান বিজয় অর্জিত হয়।  কিন্তু রাজশাহী হানাদার মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। আমরা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ৭ নং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কাজী নূরুজ্জামানের নির্দেশে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে মেজর শর্মা ও তাঁর আর্টিলারি বাহিনির ক্যাপ্টেন আইএস ক্রোপান্ধির সঙ্গে পদ্মনদী পার হয়ে ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়ে রাজশাহীর বসড়ি, কাঠালবাড়িয়া এলাকা ঘিরে ফেলি। পাকবাহিনি নাটোর পালিয়ে যায়। নবাব সিরাজ উদদৌলা কলেজ মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ বাহিনির কাছে পাক সেনারা আত্মসমর্পন করে ২২ ডিসেম্বর।


অনেক মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, জীবিত আছেন, তাদের নাম নিতে না পারায় নিজেকে অপরাধী মনে করছি। আর ভারতের সেনাবাহিনি ও মিত্র বাহিনিকে স্যালুট জানিয়ে শেষ করার আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জোহা হল, নবাব আব্দুল লতিফ হল ও সৈয়দ আমির আলী হলে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র জমাদান বা আর্মস সারেন্ডার অনুষ্ঠানের কথা স্মরণ করছি। 


লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সভাপতি, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১ রাজশাহী।