ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ নিয়োগ
কুড়িগ্রামে সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না
‘তিন দিন ঘুরছি, সার পাই নাই: মারি ফেলার বুদ্ধি করছে’
সোনার দেশ ডেস্ক
কুড়িগ্রামে সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না। একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। বিতরণে অব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের ক্ষোভ বাড়ছে। বিতর্কিত হচ্ছে সরকারও। অব্যবস্থাপনার জন্য কৃষি বিভাগের ‘একগুঁয়েমি’ এবং অবহেলাকে দায়ী করছে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা।
স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, পুলিশ ও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগের দাবি, ডিলারের গুদাম থেকে সরিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এক ডিলার পয়েন্টে শত শত কৃষককে জড়ো করে সার বিতরণ করা হচ্ছে। এতে বিশৃঙ্খলা ঠেকানো যাচ্ছে না। বারবার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েও সার নিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে কৃষক। বিব্রত হচ্ছে সরকার।
তবে প্রশাসনের দাবি, তাদের চেষ্টার কমতি নেই। কৃষি বিভাগের আগ্রহে ঘাটতি এবং সহযোগীতার অভাবে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়ন হচ্ছে না। এতে করে স্থানীয় প্রশাসনও বিব্রত।
প্রতি সপ্তাহেই জেলায় সার নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুরে ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ভিড় দেখে সটকে পড়েন ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস)। ক্ষোভে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। পরে প্রশাসন ও অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গত রবিবার কুড়িগ্রাম সদরের ঘোগাদহ ও ভোগডাঙা ইউনিয়নে ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণকালে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঘোগাদহে সার বিতরণে বিলম্ব হওয়ায় ডিলার গুদামের সামনে অপেক্ষমান কৃষকরা বিএসকে মারধর করে আহত করেন।
তারও আগে গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নে ডিলারের গুদামে আরেক বিএসকে অবরুদ্ধ করেন কৃষকরা। রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর ইউএনও ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিএসকে উদ্ধার করেন। তার একদিন আগে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চর রাজিবপুর উপজেলার রাজিবপুর বাজারের ডিলারের গুদাম ভাঙচুর করে সার নিয়ে যান ক্ষুব্ধ কৃষকরা।
একই ঘটনা ঘটে গত ৭ সেপ্টেম্বর রৌমারীতে এবং গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীতে। এসব ঘটনায় কৃষি বিভাগের সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকদের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার নিয়ে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেনি কৃষি বিভাগ। বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কৃষক, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিএনপি নেতৃবৃন্দ ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের পরামর্শ দিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সার বিতরণে বিশৃঙ্খলার খবরে কুড়িগ্রাম আসেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম। তিনি গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রৌমারীতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরের দিন রবিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বৈঠকে কৃষকদের সুবিধা এবং সুষ্ঠু বিতরণের স্বার্থে ডিলার গুদামের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিরা বলছেন, সম্মেলন কক্ষের সিদ্ধান্ত কক্ষের ভেতরই রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়নি। বৈঠক চলাকালে সদরের ভোগডাঙা, ঘোগাদহ এবং হলোখানা ইউনিয়নে ডিলারদের গুদামের সামনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কৃষি কর্মকর্তা হামলার শিকার হন। এরপরও কৃষি বিভাগের টনক নড়ছে না।
কৃষকরা বলছেন, ডিলার পয়েন্টে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী সার মেলে না। বেশিরভাগ কৃষক সার না পেয়ে ফিরে যান। ডিলার পয়েন্টে গিয়ে অনেকে মজুরি আয় থেকে বঞ্চিত হন। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার দিলে তারা প্রয়োজন মতো নিতে পারবেন। এতে ভিড় কিংবা ভোগান্তি হবে না।
মঙ্গলবার উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর বাজারে ‘মেসার্স মো. আকবর আলী’ নামে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ইউনিয়নের সব কৃষক সারের জন্য ভিড় করেছেন। পাঁচ জনকে ১ বস্তা সার দেওয়ার পরও অনেক কৃষক সার না পেয়ে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করেন।
ইউনিয়নের যমুনা এলাকার কৃষক রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন দিন ঘুরি গেছি। আইজ সার নিবার আসছি। পাই নাই। এলা কবার লাগছে পাঁচ জন লাগবে। পাঁচ ভাইয়ের আইডি কার্ড আনছি। সেটা নাকি হবার নয়। পাঁচ জনকেই লাগবে। এলা ওমরা কি কামলা বাদ দিয়া ১০ সের সারের জন্য আসবে। এগলা তো মারি ফেলার বুদ্ধি করছে। এলা হামার আবাদও শ্যাষ, কামলাও শ্যাষ।’
একই ইউনিয়নের আরেক কৃষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য সোলজার বলেন, ‘আগে ডিলারের ঘর থেকে সার নিই নাই। এবার এই নিয়ম করে ভোগান্তি বাড়াইছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ে থাকা লাগে। এভাবে সার নেওয়া সম্ভব? মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। আগে খুচরা দোকানে সার দিতো। মানুষের যার যতটুকু দরকার সেখান থেকে নিত। এখনও সেটাই করা উচিত।’
এ বিষয়ে বিসিআইসি সার ডিলার রমজান আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বছরও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণ হয়েছে। এবার শুধু ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণ হওয়ায় ইউনিয়নের কৃষকরা এক স্থানে জড়ো হচ্ছেন। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এমন হতো না।’
উলিপুর উপজেলা কৃষি অফিসার শহীদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হলেও সেটা চালু হয়নি। শুধু ডিলার গুদাম থেকে সার দেওয়া হচ্ছে।’ অন্য উপজেলাগুলোতেও একইভাবে বিতরণের খবর পাওয়া গেছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘সর্বসম্মতিক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেটা অনুসরণ না করায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এটা কার্যকর করছে না তা বুঝতে পারছি না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি অন্নপূর্ণা দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণে বারবার বলা হলেও তারা গড়িমসি করছে। জেলায় মাঠপর্যায়ে তাদের কাজের গাফিলতি ও অনাগ্রহ রয়েছে। সার বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এজন্য ডিডিকে বদলিও করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। পর্যায়ক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণ শুরু হচ্ছে।’
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোনও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে। এসব নিয়োগের বড় অংশই হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা থেকে। এর মধ্যে শুধু পটিয়া উপজেলারই রয়েছেন ৫ হাজার ১৪৮ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে অনিয়মের অভিযোগে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটি পরিদর্শন শেষে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিমালাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
সিভি জমার জন্য ছিল আলাদা বাক্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে গ্রুপের অফিসে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার জন্য আলাদা বাক্স রাখা হয়েছিল। এসব বাক্সে বিভিন্ন পদ ও এলাকার নাম উল্লেখ করা থাকত।
এর মধ্যে ছিল ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘সনাতন জেনারেল’, ‘মহিলা ক্যাশ’, ‘পিয়ন-ডিপ্লোমা’, ‘পুরুষ জেনারেল’ ও ‘পুরুষ ক্যাশ’সহ বিভিন্ন ক্যাটাগরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল দৈবচয়নের ভিত্তিতে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত ১০ জন কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেয়। তারা জানিয়েছেন, এস আলমের পটিয়ার বাড়ি ও আসাদগঞ্জের অফিসে রাখা বাক্সে তাঁরা সিভি জমা দিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁদের মৌখিক পরীক্ষা এবং পরে যোগদানপত্র দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে দুজনের কোনও মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি।
ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালাও মানা হয়নি
ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনও পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বরকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করার কথা।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭টি পদে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৭৮৯ জন এবং ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে ২ হাজার ১৬০ জন নিয়োগ পান। এছাড়া মেসেঞ্জার কাম গার্ড পদে ১ হাজার ৫৪৪ জন, রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিমের (আরডিএস) স্টাফ হিসেবে ৯১৫ জন এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে ৫০১ জন নিয়োগ দেওয়া হয়।
উচ্চপদেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই দুজন এমডি, আটজন ডিএমডি, দুজন এসইভিপি এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের একজন প্রিন্সিপাল নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচজন ইভিপির মধ্যে চারজনকেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ডিএমডি হতে অন্তত ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তী পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ শর্ত পূরণ না করেই এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে আট বছরের এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় ডিএমডি করা হয়।
নিয়োগে চট্টগ্রামের আধিপত্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলারই ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে পটিয়া উপজেলার ৫ হাজার ১৪৮ জন।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কক্সবাজারের ৩৯৮ জন। কুমিল্লার ১১৪, ময়মনসিংহের ৯৯, বগুড়ার ৯৭ এবং ঢাকা জেলার ৯৬ জন নিয়োগ পেয়েছেন। রাজশাহীর ৮৩, যশোরের ৭৮, গাইবান্ধার ৭৫ এবং রংপুরের ৬৬ জনও নিয়োগ পেয়েছেন। বাকি ৫৪ জেলা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় ১ হাজার ৬২৭ জনকে।
বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৭ সালে ৩৬৭ জন, ২০১৮ সালে ১ হাজার ১১৮, ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৬৭, ২০২০ সালে ২ হাজার ১১০, ২০২১ সালে ৮৬৫, ২০২২ সালে ২ হাজার ১১৯, ২০২৩ সালে ৩৯৭ এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৩৯২ জন নিয়োগ পান।
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও প্রশ্ন
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে ১৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয় কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। তাদের মধ্যে ১২ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পান। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮৪০ জনের সিভি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ৭৬৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পান মাত্র ৩৬ জন। পরে নম্বরের শর্ত শিথিল করে ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া প্রার্থীদেরসহ ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে এবং ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের সবাই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা ছিলেন।
পরবর্তীতে ওই ব্যাচের ১৮৪ জন যোগদান করেন। তাদের মধ্যে বর্তমানে ৩১ জন চাকরিতে আছেন। ২১ জন পদত্যাগ করেছেন এবং ১৩১ জন চাকরি হারিয়েছেন। একজন মারা গেছেন।
তবে ২০১৭ সালের ১৪৪ জন এবং ২০২৪ সালের ২০০ জন প্রবেশনারি অফিসারের নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যায়ন পরীক্ষার পর ছাঁটাই
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন এবং চারটি বহির্নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষায় ওই সময়ের নিয়োগে বিভিন্ন অনিয়ম চিহ্নিত হয়। এরপর এসব নিয়োগের যোগ্যতা যাচাইয়ে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ।
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ওই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষা দিয়ে সবাই চাকরিতে বহাল আছেন। ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। পরে বিভিন্ন কারণে আরও ২৮৭ জনকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়।
পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। এদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে। এছাড়া ১৫৫ জন কক্সবাজারের এবং অন্য জেলারও কর্মী রয়েছেন।
এদিকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ের নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আরও কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। বিভিন্ন অভিযোগে ১২১ জন, চুক্তির মেয়াদ শেষে নবায়ন না করায় ১ হাজার ১৯০ জন এবং অন্যান্য কারণে ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, তাদের প্রথমে ওএসডি করা হয় এবং পরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন