বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

নিউগিনি প্রপার্টিজ : মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ে হামলা, সাবেক মেজর জেনারেলসহ আসামি দুই শতাধিক

সোনার দেশ ডেস্ক ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৮ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৮ অপরাহ্ন
নিউগিনি প্রপার্টিজ : মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ে হামলা, সাবেক মেজর জেনারেলসহ আসামি দুই শতাধিক
শনিবার রাতে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা/ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

রাজধানীর নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, রাতের অন্ধকারে দুটি ট্রাকে করে লোকজন এসে নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা চালায়। এ সময় মুহুর্মুহু গুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে হামলাকারীরা প্রকল্পে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।


ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।


ওই ঘটনায় সাবেক মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।


এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে একজনকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।


রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের পক্ষ থেকে মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাটি করেন।


মামলায় নাম থাকা অন্য আসামিরা হলেন- শাহরিয়ার মাহমুদ, মো. আবুল কাশেম, মো. বাবুল হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান, মতিউর রহমান, মজিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, এমকে আজাদ, মো. মামুন, মো. আসলাম ও মুন্না।


৫০ রাউন্ড গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি

মামলার এজাহারে বাদী নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের পক্ষ থেকে মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, পূর্বশত্রুতার জেরে ক্যান্টনমেন্ট থানার দক্ষিণ মানিকদীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রপার্টিজের প্রকল্পে এক নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদের ইন্ধন ও নির্দেশে অন্য আসামিরা এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেন। তাদের হাতে শটগান, রিভলবার, চাপাতি, রামদা, ছোরা, রড ও লাঠিসোঁটা ছিল। এ সময় তারা আনুমানিক ৫০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। গুলির শব্দে প্রকল্পে থাকা শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মীরা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন।


এজাহারে হামলা-ভাঙচুরের বর্ণনা

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শনিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসামিরা নিউগিনি প্রপার্টিজের প্রকল্পে প্রবেশ করেন। তাদের হাতে পিস্তল, শটগান, রিভলবার, চাপাতি, রামদা, ছুরি, রড ও লাঠিসোঁটা ছিল। তারা কয়েক দফা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।


এ সময় প্রকল্পের শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মীরা ছোটাছুটি শুরু করেন। হামলাকারীরা প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. পারভেজকে মারধর করেন। একজন রিভলবারের বাঁট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। পরে ছুরি দিয়ে তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে, বাম হাত ও পিঠে আঘাত করা হয়।


পারভেজকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে নিরাপত্তাকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলামকেও মারধর করা হয়। তার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা, একটি বাটন মোবাইল ফোন ও একটি ওয়্যারলেস সেট নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।


হামলাকারীরা প্রকল্পের প্রধান ফটকে গুলি করে লোহার গেট, থাইগ্লাস ও কাচের গেট ভাঙচুর করেন। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে অফিসকক্ষে ঢুকে কম্পিউটার মনিটর, ডিভিআর, ফ্রিজ, ল্যাপটপ, টেবিল, চেয়ার ও আলমারি ভাঙচুর করা হয়। এতে আরও প্রায় ১২ লাখ টাকার ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।


২৫ লাখ টাকা ও নির্মাণসামগ্রী লুটের অভিযোগ

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, অফিসের একটি লকার ভেঙে নির্মাণসামগ্রী কেনার জন্য রাখা ২৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবনের পাশে রাখা ২৩ টন রড, যার আনুমানিক মূল্য ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং প্রায় চার লাখ টাকা মূল্যের একটি সিএফ স্কুটার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।


স্টোররুম থেকেও বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের ২০০ কয়েল তার, পাঁচটি পানির পাম্প, নির্মাণসামগ্রী ওঠানোর সরঞ্জাম, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সিসি ক্যামেরা, ডিভিআর ও মনিটরসহ বিভিন্ন মালামাল রয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।


ভাঙচুর হয়েছে সালমানের স্টুডিওতেও

নিউগিনি প্রপার্টিজের একটি পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও পরিচালনা করতেন আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির। হামলাকারীরা সেখানে ঢুকে দুটি টেলিভিশন, এসি ও অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন।


এতে প্রায় ৯৫ লাখ টাকার ক্ষতি এবং বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।


এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, হামলা ও ভাঙচুরে মোট ১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি এবং ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মালামাল চুরি হয়েছে।


দুই ট্রাকে লোকজন গিয়ে হামলা

সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ, শনিবার রাতে দুটি ট্রাকে করে লোকজন গিয়ে তার স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর চালান। রাত পৌনে ২টার দিকে স্টুডিওটির ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে এসে তিনি বলেন, কিছুক্ষণ আগে সেখানে হামলা হয়েছে এবং পুরো স্টুডিও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।


নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের কাছ থেকে একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও পরিচালনা করতেন সালমান মুক্তাদির।


পুলিশ বলছে, নিউগিনি প্রপার্টিজের জমির মালিক এবং এলাকার অন্য জমির মালিকদের মধ্যে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই বিরোধের মধ্যে পড়ে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলির অভিযোগ

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এ সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাঁচটি শটগানের গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি পিস্তলের গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।


পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মো. মামুন ও মো. আসলামকে গ্রেফতার করে। মামুনের কাছ থেকে কাঠের বাঁটসহ দুটি ধারালো ছুরি এবং আসলামের কাছ থেকে একটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুন্নাকে গ্রেফতার করা হয়।


পুলিশ জানিয়েছে, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শাহরিয়ার মাহমুদকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।


ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’


পুরো স্টুডিওই ক্ষতিগ্রস্ত

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর প্রতিনিধি ইলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঘটনার রাতে স্টুডিওতে দুজন ছিলেন। পাশের নির্মাণকাজ থেকে শব্দ আসছে মনে করে তারা প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেন। পরে দুর্বৃত্তদের প্রবেশের বিষয়টি টের পেয়ে তারা ওয়াশরুমে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে তাকে ফোন করে বিষয়টি জানান। পরে আবার ফোন করা হলে তাদের আর পাওয়া যায়নি। ততক্ষণে দুর্বৃত্তরা তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছিল।’


ইলা বলেন, ‘মাস্ক পরা দুই ব্যক্তি স্টুডিওতে ঢুকে ফোনসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যান। স্টুডিও থেকে একটি ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, চারটি লাইট, চারটি সফটবক্স এবং সিসিটিভির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়েছে। পুরো স্টুডিওই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পুনর্ব্যবহার বা চালু করার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই।’


ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানের কোনো চাঁদার বিষয় কিংবা শত্রুতার কারণে এ হামলা হয়েছে কি না, তা তারা জানেন না বলেও জানান ইলা।


তিনি জানান, তারা মূলত পরিস্থিতির শিকার। পুরো প্রকল্প বা এর মালিকের সঙ্গে কোনো বিরোধের কারণে তাদের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।


‘৪০ বছরে যা জমিয়েছি সব শেষ’

প্রকল্পের ম্যানেজার জামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সেখানে মোট ১২টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি নিউগিনি প্রকল্পের, বাকিগুলো অন্য ব্যক্তির।’


তিনি বলেন, ‘এশার নামাজের জামাত শেষ করে তিনি বাসায় গিয়ে শুয়েছিলেন। অফিসে থাকলে তাকেও হামলাকারীরা মেরে ফেলতে পারতেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।’


জামাল উদ্দিন বলেন, ‘৪০ বছরে যা জমিয়েছি, সব শেষ করে দিয়েছে। সামনের মাসে নতুন বাসায় উঠবো বলে মালপত্র সব এখানে রেখেছিলাম।’


তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ