সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লার ‘ছবিকাণ্ডে’ গণবদলি ঘিরে প্রশ্ন

সোনার দেশ ডেস্ক ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ন
পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লার ‘ছবিকাণ্ডে’ গণবদলি ঘিরে প্রশ্ন
নৌকা-দাঁড়িপাল্লার ছবি রাখা ঘিরে দুই দিনে ১০ কর্মকর্তাকে বদলি/ছবি: এনসিটিবি

পাঠ্যবইয়ে দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার অপ্রয়োজনীয় ছবি রাখাকে কেন্দ্র করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ৯ জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাদের বদলি করা হয়।


এর আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) আরেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। দুই দিনে ১০ কর্মকর্তার এ গণবদলি ঘিরে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এনসিটিবি সূত্র বলছে, যাদের এ কাজের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই, এমন কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে।


পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার ছবি রাখা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সৃষ্ট অস্থিরতার সুযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার উসকানিতে গণবদলি করা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত কর্মকর্তা এনসিটিবি সচিবের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


দুইদিনে ১০ কর্মকর্তাকে বদলি

ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা রাখার ঘটনায় গবেষণা কর্মকর্তা মু. আব্দুল্লাহ আল যোবায়েরকে রোববার বদলি করে খাগড়াছড়িতে পাঠানো হয়। তিনি ওই বইটি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।


তবে সোমবার যে ৯ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, তার মধ্যে অনেকের এ ঘটনায় সম্পৃক্ততা নেই। তাদের সম্পাদিত বইয়েও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়েনি। তাদের মধ্যে অন্যতম এম এম আসাদুজ্জামান। তিনি অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইটির দায়িত্বে ছিলেন। এবার বইটিতে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসসহ নতুন বিভিন্ন তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। তাতে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া যায়নি।


পাশাপাশি আসাদুজ্জামান বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ছাত্রজীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। ২০০৬ সালের কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন।


অথচ ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে দাঁড়িপাল্লা ও প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির বইয়ে নৌকা রাখার ঘটনায় তাকে লালমনিরহাট সরকারি কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে বদলি করা হয়েছে। বিএনপি সরকারের আমলে ছাত্রদলের সাবেক নেতা আসাদুজ্জামানের বদলি ঘিরে খোদ এনসিটিবির কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।


ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই সম্পাদনার কাজ করেছেন গবেষণা কর্মকর্তা মাহমুদ বিন আমিন। তাকেও বদলি করা হয়েছে। অথচ তার বইয়েও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ নেই। মাহমুদকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে সমাজকল্যাণ/সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে বদলি করা হয়েছে।


৭ কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে বদলি

গণবদলির শিকার বাকি ৭ জন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত। তাদের অনেকে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে এনসিটিবিতে পদায়ন পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তারা বিভিন্ন তদবির করে এনসিটিবিতে টিকে যান।


আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে বদলি করা ৭ কর্মকর্তা হলেন- এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ ও পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হক ভূঞা; গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর; শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মো. আহসানুল আরেফিন চৌধুরী।


গবেষণা কর্মকর্তা ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আবু হানিফ; সম্পাদক অধ্যাপক রেজাউল করিম; গবেষণা কর্মকর্তা ও সহকারী অধ্যাপক মনির হোসেন মজুমদার; বিশেষজ্ঞ ও ইংরেজির সহযোগী অধ্যাপক আফসানা আইয়ুব।


আওয়ামী লীগপন্থি ট্যাগিং দিয়ে বদলি করা দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি বিগত বছরগুলোতেও ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে এ ছবিগুলো থাকলেও কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। হঠাৎ এখন দাঁড়িপাল্লার ছবি রাখা ঘিরে বিতর্কের মধ্যে নৌকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যদি কর্তৃপক্ষ এটা আমাদের নোট দিতো, তাহলে আমরা পরিবর্তন করতাম। কিন্তু কোনো নোট দেওয়া হয়নি, নির্দেশ পাওয়া যায়নি, অথচ এখন দোষারোপ করে বদলি করা হচ্ছে। 


নৌকার ছবি রাখা বইয়ের সম্পাদকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

এদিকে, পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি রাখার ঘটনায় আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গণহারে বদলি করা হলেও অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে অপ্রয়োজনে অনেক জায়গায় নৌকার ছবি ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।


অথচ প্রাথমিক স্তরের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. আব্দুল মুমিন মোছাব্বির এবং চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের কাজ করা গবেষণা কর্মকর্তা মো. রাকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বদলির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি ও পদায়নের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। কী কারণে এবং কেন তাদের বদলি করা হয়েছে, সেটিও আমি জানি না।’


তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ