বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬

শাকিল হত্যায় এমপির ছেলের রিমান্ড, জানাজায় ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান; পরে শপিংমলে ভাঙচুর

নাটোর প্রতিনিধি ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নাটোর প্রতিনিধি ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন
শাকিল হত্যায় এমপির ছেলের রিমান্ড, জানাজায় ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান; পরে শপিংমলে ভাঙচুর

ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যার ঘটনায় নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। অন্যদিকে শাকিলের জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানের মুখে পড়েন সংসদ সদস্য। জানাজার পর চাঁচকৈড় বাজারে একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। একের পর এক এসব ঘটনায় গুরুদাসপুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও নিহতের বাবার বক্তব্য তদন্তে রেকর্ড করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


জানাজায় এমপিকে ঘিরে উত্তেজনা

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ মাঠে শাকিলের জানাজার আগে বক্তব্য দিতে যান সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ। ‘প্রিয় ভাইয়েরা আমার, আমার একটা কথা শুনতে হবে দাদারা’—বলে বক্তব্য শুরু করতেই উপস্থিত নেতাকর্মী ও মুসল্লিদের একাংশ ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতির কারণে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।


এ সময় সংসদ সদস্য বলেন, তাঁর ছেলেও যদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে তিনি ছেলের পাশে নয়, শাকিলের পাশেই থাকবেন।


পরে জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ছাত্রদলের রাজনীতি করেই তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। শাকিল হত্যার বিচার হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।


এরপর সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ নিহতের পরিবারকে তাঁর পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে মাইক্রোফোন হাতে নেন হুইপ দুলু।


জানাজার পর শপিংমলে ভাঙচুর-লুটপাট

জানাজা শেষে চাঁচকৈড় বাজারে প্রবাসী রাসেলের মালিকানাধীন রাশ আরবানী শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কারা এ ঘটনায় জড়িত, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং জানাজার উত্তেজনার সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে শপিংমলে হামলার ঘটনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।


এমপির ছেলের তিন দিনের রিমান্ড

শাকিল হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে মঙ্গলবার বিকেলে নাটোর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক আমীর হোসেন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক মাহমুদুল হাসান তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।


এর আগে সোমবার দিবাগত রাত ১টার দিকে গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবাড়িষা এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া যায়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।


নিহতের বাবার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন

শাকিলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সন্তান হারানোর শোকের মধ্যে তাঁর বাবা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, তিনি ছেলের হত্যার বিচার চান।


তবে হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় ১১ থেকে ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও নিহতের বাবার বক্তব্য তদন্তে রেকর্ড করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বক্তব্য রেকর্ড করা না হয়ে থাকলে কেন নেওয়া হয়নি, আর নেওয়া হয়ে থাকলে তা তদন্তে কীভাবে বিবেচনায় এসেছে—এসব বিষয়ে পুলিশের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


যেভাবে হামলার শিকার হন শাকিল

গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম। পথে মোটরসাইকেলে করে ধাওয়া করে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে তাঁর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। গুরুতর আহত শাকিল পরে মারা যান।


এ বিষয়ে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, গুরুদাসপুরের ঘটনায় পুলিশ সতর্ক রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। শাকিল হত্যা ও অন্যান্য আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


শাকিল হত্যার বিচার, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং জানাজার পর শপিংমলে হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা—এখন তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত ধরে না নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি।