বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬

রাজশাহীর বিলভ্যালা ও বিলজোয়ানী জলাভূমিনির্ভর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কার্যকর সংরক্ষণের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন
রাজশাহীর বিলভ্যালা ও বিলজোয়ানী জলাভূমিনির্ভর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কার্যকর সংরক্ষণের দাবি

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিলভ্যালা ও তানোর উপজেলার বিলজোয়ানীকে দেশের প্রথম জলাভূমিনির্ভর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু জলাভূমি দুটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।ফলে সেখানের জীববৈচিত্র্য ঝঝুকির মধ্যে রয়েছে। দাবি উঠেছে দেশের প্রথম জলাভূমি-নির্ভর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য দুই জলাভূমির সীমানা চিহ্নিতকরণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, দূষণ ও পাখি শিকার বন্ধ করা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার। পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা বলছেন, স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদ ও প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপউ নিচ্ছেন না।


জলাভূমি দুটির সংরক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর উদ্যোগে বিলভ্যালা ও বিলজোয়ানী এলাকায় পৃথক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এতে বেলা ও রুলফাও (জটখঋঅঙ)-এর কর্মকর্তারা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আশিকুর রহমান সমী, শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তারেক এবং দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাতসহ অনেকে।


মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, অভয়ারণ্য ঘোষণা সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও আইনি স্বীকৃতিকে বাস্তব সুরক্ষায় রূপ দিতে হবে। এজন্য অবৈধ দখল ও ভরাট প্রতিরোধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ জরুরি।


১৬ দশমিক ৭৩ একর জলাভূমি সংরক্ষিত:

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৭ মে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তানোরের বিলজোয়ানী মৌজার ১ দশমিক ৬৫ একর এবং গোদাগাড়ীর বিলভ্যালা মৌজার ১৫ দশমিক ০৮ একর জলাভূমিকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। দুই অভয়ারণ্যের মোট আয়তন ১৬ দশমিক ৭৩ একর।


জলাভূমি দুটি দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কালিম, কোড়া, ডাহুক, গুরগুরি, জলপিপি ও জলময়ুরের মতো জলচর পাখির পাশাপাশি শীতকালে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস এখানে আশ্রয় নেয়। মাছ, ব্যাঙ, শামুক-ঝিনুক, সরীসৃপ ও জলজ উদ্ভিদও এখানকার বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণে হুমকি:

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জলাভূমির জমিতে কৃষিকাজ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দূষণ, পর্যটনজনিত দূষণ, পাখি শিকার এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ ও শামুক আহরণ জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে।


বিলজোয়ানী এলাকায় নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ এবং বিলভ্যালায় জলাভূমির জমিতে কৃষিকাজের চেষ্টা উদ্বেগের কারণ। অতিসূক্ষ্ম জাল ও ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ আহরণ জলজ প্রাণীর প্রজনন ব্যাহত করে। অন্যদিকে, কৃষিজমি থেকে রাসায়নিক বিলে পৌঁছালে মাছের পোনা, ব্যাঙাচি ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব কারণে পাখির খাদ্য ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থলও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সংরক্ষণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:

মানববন্ধন থেকে অভয়ারণ্য দুটির সীমানা সরকারি প্রজ্ঞাপন, মৌজা ও দাগ নম্বর অনুযায়ী চিহ্নিত করা, সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি পাখি, মাছ, শামুক-ঝিনুক ও জলজ উদ্ভিদের নিয়মিত জরিপ, পানির গুণমান পর্যবেক্ষণ এবং দূষণের উৎস শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


বন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সংরক্ষণ কার্যক্রমে কৃষক, জেলে, নারী, তরুণ ও স্থানীয় পরিবেশবাদীদের সম্পৃক্ত করে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তোলারও আহ্বান জানানো হয়।


বিলভ্যালা ও বিলজোয়ানী পাখি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব উদ্যোগে বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা ও জলাভূমির ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।


বক্তারা আরও বলেন, শুধু বিলভ্যালা ও বিলজোয়ানী নয়, রাজশাহীর অন্যান্য জলাভূমিও দখল, দূষণ, পানিপ্রবাহে বাধা, অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ ও শামুক-ঝিনুক সংগ্রহসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব কর্মকাণ্ড জলাভূমির পানিধারণ ক্ষমতা কমিয়ে মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য, আশ্রয় ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত করছে।


তাই অভয়ারণ্য দুটির পাশাপাশি রাজশাহীর সব জলাভূমিতে জলজ ও জলাভূমিনির্ভর প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ও অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সরকারি সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম, আইনের প্রয়োগ, নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহীর জলাভূমি, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।