রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

সাইফুর রহমান তপন ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:১২ অপরাহ্ন মতামত
সাইফুর রহমান তপন ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:১২ অপরাহ্ন
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন। সেই সঙ্গে ১৯৮০-এর দশকের সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দুই নেত্রীকেন্দ্রিক দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান হলো। ব্যবস্থাটি গত বছরের ৫ আগস্টই ভেঙে পড়েছিল, যখন শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে প্রায় সপারিষদ দেশত্যাগ করতে হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। 


তবে গত বছরের ৭ আগস্ট নয়াপল্টনের দলীয় সমাবেশে ভিডিও লিঙ্ক মারফত দেওয়া খালেদা জিয়ার ভাষণ শুনে অনেকেরই ধারণা হয়েছিল, রাজনীতিতে আবারও সক্রিয় হবেন তিনি। হয়তো চতুর্থবারের মতো অলংকৃত করবেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন। অভ্যুত্থানের পর বিগত সরকারের আমলে দেওয়া সব দণ্ড ও মামলা থেকে মুক্ত হয়ে খালেদা জিয়া বিদেশে চিকিৎসা নেন। অনেকটাই সুস্থ হয়ে ফিরেছিলেন তিনি। তবে হঠাৎ গত ২৩ নভেম্বর নানা সংক্রমণ নিয়ে তিনি আবারও ভর্তি হন এভারকেয়ার হাসপাতালে। এ দফায় তিনি আর ফিরলেন না। মঙ্গলবার ভোরে চলে গেলেন অনন্তের ডাকে।



গৃহবধূ হয়েও খালেদা জিয়া কীভাবে বাংলাদেশের ঝঞ্ঝামুখর রাজনীতিতে জায়গা করে নিলেন, এ কাহিনি এখন কারও অজানা নয়। তবে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েও কীভাবে বিপুল এ জনপ্রিয়তা ধরে রাখলেন, তা নিয়ে কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। এ দেশে ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তা বরাবরই কচুপাতার পানির মতো। তবে নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া সম্ভবত কখনোই জনপ্রিয়তা হারাননি; দল নানা সময়ে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লেও। জীবনে পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩টিতেই জয় পেয়েছেন তিনি। এমনকি ২০০৮-এ অনুষ্ঠিত সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে তাঁর দল এর আগের সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন থেকে ২৯টিতে নেমে গেলেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই জয় পেয়েছিলেন। 


আসলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের স্বর্ণসময় ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন। রাজনীতিতে তখনই তাঁর উত্থান ঘটে। তখনই এতে তাঁর আসন পকাপোক্ত হয়। 

১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনোত্তর সময়ে আমি ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; ছাত্র রাজনীতিতেও ঘনিষ্ঠভাবে সক্রিয় ছিলাম। সকালে ও দুপুরে ক্যাম্পাসে, বিকেলে পল্টন, প্রেস ক্লাবে, আর রাতে হলে মিছিল করতে হতো। তখন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা– দুজনই নিজ নিজ ছাত্র সংগঠন আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের হল পর্যায়ের অনুষ্ঠানেও আসতেন প্রধান অতিথি হিসেবে। দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের মাঝে হু-হু করে বাড়ছিল খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা। আদর্শিক বা দার্শনিক কারণ যেমন তেমন, সবাই বলত আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আট দলের অংশগ্রহণের বিপরীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের তা বর্জন করার ফল ছিল এটা। 


এমন না যে, তৎকালীন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকা অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল। তখন জাসদ ছাত্রলীগও লড়াকু ছিল; আমাদের সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টও জানবাজি রেখে ওই আন্দোলনে যুক্ত ছিল। জাসদসহ আমরা ছিলাম তিন জোটের এক জোটে– আট দল, সাত দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনকারী পাঁচদলীয় বাম জোটে। আমার মনে আছে, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বিরোধের জেরে ছাত্রদল, জাসদ ও অন্যান্য বাম সংগঠন মিলে আট দলভুক্ত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। কিন্তু তাদের ছাড়া আন্দোলন চাঙ্গা হচ্ছিল না। তখন ছাত্রদলের সম্মতি নিয়ে বাম ছাত্রনেতারা ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বকে ক্যাম্পাসে ফিরতে বলেন। জাতীয় পর্যায়েও তিন জোট সমন্বিতভাবে আবারও মাঠে নামে। এরই ফল ছিল ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি, যেখানে শ্রমিক নূর হোসেন বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/ গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে শহীদ হন। 

খালেদা জিয়া আপসহীন মনোভাব এর পরও বহুবার দেখিয়েছেন। বিশেষত গত সরকারের আমলে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিনিময়ে তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার অফার দেওয়া হয়েছিল; তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর দল ও আন্দোলন নিয়ে তাঁর দৃঢ়তাই ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। বিএনপি তৈরি হয়েছিল প্রধানত বিভিন্ন দলছুট নেতাদের নিয়ে। খালেদা জিয়া যেসব নেতাকে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে পেয়েছিলেন, তাদের বড় অংশই তাঁকে ছেড়ে এরশাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। এমনকি খোদ মহাসচিব কেএম ওবায়দুর রহমান ১৯৮৮ সালে এরশাদের সঙ্গে হাত মেলানোর দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। ওইসব নেতা ভেবেছিলেন, এই ‘গৃহবধূ’ তাদের কথামতোই চলবেন। কিন্তু দিন যত গিয়েছে তত তারা বুঝেছেন, খালেদা জিয়া অন্য ধাতুতে গড়া। 




ছাত্রদল সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। গোলাম সারোয়ার মিলন ও জালাল আহমেদের মতো কয়েকজন সভাপতি এরশাদের আনুগত্য স্বীকার করেন। সানাউল হক নীরু, গোলাম ফারুক অভিসহ জিয়াউর রহমানের স্নেহধন্য ছাত্রনেতাদের প্রায় সবাই একই পথ ধরেন। ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগে আগে তাদের ওই এরশাদপ্রীতি আবিষ্কৃত হয়। খালেদা জিয়া পুরো গোষ্ঠীকে ছাত্রদল থেকে বের করে দেন। একেবারে শেষ সময়ে তখনও মাঝের সারিতে থাকা আমান উল্লাহ আমান, খায়রুল কবীর খোকনের মতো ছাত্রনেতাদের ডাকসুতে মনোনয়ন দেন। ভোটের দিন তাদেরই জয়জয়কার দেখা গেল। এটা যে খালেদা জিয়ার প্রতি সেই সময়ের তরুণদের আস্থার প্রতিফলন ছিল, ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।


মনে আছে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নাগরিক সমাজের আকাঙ্ক্ষা ছিল দুই নেত্রী একসঙ্গে বসলে আন্দোলন কম সময়ে সফল হতে বাধ্য। এক পর্যায়ে তা সম্ভবও হয়েছিল, প্রয়াত বিশিষ্ট সাংবাদিক ফয়েজ আহ্‌মদের চেষ্টার ফলস্বরূপ। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার সমাবেশে গুলিতে ২৪ জন নিহত হন। এর প্রতিবাদে তিন জোট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যৌথ সমাবেশ ডাকে। সেখানে দুই নেত্রীর যোগদানের কথা না থাকলেও খালেদা জিয়া আসেন এবং মিছিলে নেতৃত্ব দেন। কথাটা তোলার কারণ হলো, সময় ও আন্দোলনের প্রয়োজনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও সঙ্গে হাত মিলাতে খালেদা জিয়ার মধ্যে কুণ্ঠা ছিল না। এমনকি গত বছরের ৭ আগস্ট– অভ্যুত্থানের পরপর খালেদা জিয়া হাসপাতাল থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে যে ভিডিও বার্তা দেন, সেখানেও একটিবারের জন্য আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেননি। এমনকি নামও নেননি। চারদিকে তখন আওয়ামী লীগের লোকদের ওপর হামলা, তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর চলছে। কিন্তু খালেদ জিয়া ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ প্রত্যাখ্যান করে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।


যেহেতু বারবার ক্ষমতায় ছিলেন; খালেদা জিয়ার নীতিগত ও ব্যবহারিক সমালোচনার সুযোগও রয়েছে। কিন্তু রাজনীতিক হিসেবে তিনি যে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তার প্রশংসা বিরোধীদেরও করতেই হবে। 


বিএনপির নেতৃত্ব এখন জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে। তারেক রহমান কি মায়ের সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারবেন? দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে প্রথম বক্তৃতায় তিনি সবাইকে নিয়ে কাজ করে ‘নিরাপদ’ সমাজ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা রাখতে হলে তাঁকে মায়ের পদাঙ্ক ধরেই হাঁটতে হবে।


সাইফুর রহমান তপন: সাবেক ছাত্রনেতা