রাজশাহীতে বাল্যবিয়ের সাথে বাড়ছে বিয়েবিচ্ছেদ
প্রতিরোধে প্রয়োজন সর্বাত্মক পদক্ষেপ
শিশু বিয়ে একটি প্রথা, যা নারীদের ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক মূল্যবোধ এবং অসম অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশে নারীদের প্রায়ই আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখা হয়। কেবল মা-বাবার মমত্ববোধ ও ভালোবাসা পারে সামাজিক ব্যাধি নামক ভয়ংকর বাল্যবিবাহ রুখে দিতে পারে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ‘রাজশাহীতে বাল্যবিয়ের সাথে বাড়ছে বিয়েবিচ্ছেদ’ শিরোনামে সোনার দেশ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, গেল দুই বছর ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃত্ব শূন্যতা, এনজিওগুলোর বরাদ্দ কমায় ভাটা পড়েছে সচেতনতা কার্যক্রম। সরকারি দপ্তরগুলোর নামমাত্র থাকা কমিটি থামাতে পারছে না বাল্যবিয়ের হার। সরকারি-বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে আরও জোরদার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
মূলত বাল্যবিবাহ হচ্ছে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর আগে একজন ছেলে ও একজন মেয়ের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-১৯২৯ এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ সংশোধন আইন-২০১৭-এর মতে, যেসব মেয়ের বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বছর এবং ছেলের বয়স সর্বনিম্ন ২১ বছর বয়স তারাই প্রাপ্ত বয়স্ক। যারা ২১ বছর পূর্ণ করেননি এবং ১৮ বছর পূর্ণ করেননি এমন পুরুষ-নারী অপ্রাপ্তবয়স্ক। বাল্যবিয়ে হলো এইরূপ বিয়ে যার কোনো এক পক্ষ বা উভয়পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক। সাধারণত গ্রাম অঞ্চলেই বাল্যবিয়ের প্রচলন বেশি দেখা যায়।
নিরক্ষর এবং গরিব মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে থাকে। দারিদ্র, নিরক্ষরতা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা, যৌতুকের ভয়, লিঙ্গবৈষম্য বাল্যবিয়ের প্রধান কারণ। এছাড়াও রয়েছে সামাজিক প্রথা, ধর্মীয় মনোভাব সামাজিক চাপ, অবিবাহিত থাকার ভয় এবং মেয়েদের উপার্জনের অক্ষম ভাবা। বাল্যবিয়ের ফলে মেয়েদের অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ করতে হয়। এমনকি বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়। তাই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আমাদের প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনকে নারীবান্ধব ও যৌন হয়রানিমুক্ত করতে করে তুলতে হবে।
সেই সাথে বিভিন্ন স্তরে যোগ্যতা অনুযায়ী নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাটা খুব জরুরি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী নারীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। স্বল্প শিক্ষিত ও শিক্ষা ঝরেপড়া মেয়েরা যেন বেশি করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আসতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাবা-মাকেই সবার আগে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে। প্রাপ্তবয়সের আগে নিজের ছেলে বা মেয়ে যাতে তাদের পছন্দে বিয়ে না করে সেজন্য তাদের পাশে থেকে তাদের মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করতে হবে।
বাবা-মাকে প্রতিজ্ঞা নিতে হবে, মেয়েকে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই হবে তাদের মূল দায়িত্ব। প্রয়োজনে পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তার অংশগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আত্মীয়-পরিজনসহ প্রতিবেশি এবং এলাকাবাসীকে একইভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যেন তারা সন্তানকে বাল্যবিয়ে না দেন। কোথাও কোনো বাল্যবিয়ের খবর পেলে তা প্রতিরোধে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও বাল্যবিবাহ নিরোধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আগে সরকারকেও এই সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করতে হবে। শূন্য বাল্যবিবাহ ও শূন্য কিশোরী মাতৃত্বের লক্ষ্য নিয়েই সরকারকে কাজ করতে হবে। আর কেন বিয়েবিচ্ছেদ হচ্ছে সেটাও কারণ চিহিৃত করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।