বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬

৯/১১ থেকে শিক্ষা না নিয়ে ইরানে আটকে গেছেন ট্রাম্প?

সোনার দেশ ডেস্ক ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:১৪ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:১৪ অপরাহ্ন
৯/১১ থেকে শিক্ষা না নিয়ে ইরানে আটকে গেছেন ট্রাম্প?
ডোনাল্ড ট্রাম্প/ ছবি: এএফপি (ফাইল)

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তার প্রতিশ্রুতি ছিল, বিদেশে নতুন যুদ্ধ শুরু না করে চলমান যুদ্ধগুলো বন্ধ করবেন।


কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পর, ট্রাম্প নিজেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যা বিশ্লেষকদের চোখে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।


ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি অতীতের যুদ্ধগুলোর শিক্ষা আবারও উপেক্ষা করছে এবং এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা আছে কি না।


ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে ট্রাম্প ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর ওয়াশিংটনে তৈরি হওয়া ‘আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু না করার’ সীমাবদ্ধতা ভেঙেছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে তার উত্তরসূরিকে আরও গভীর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের বোঝা বহন করতে হতে পারে।


ইরাক-আফগানিস্তানের সঙ্গে পার্থক্য

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নয়।


ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শত্রু সরকার উৎখাত করেছিল, হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন করেছিল এবং বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে রেখে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। এসব যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি হয় এবং পশ্চিমা ধাঁচের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি।


ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিমান ও নৌ শক্তির ওপর নির্ভর করছে। এসব হামলায় ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির সরকার এখনো পরাজিত হয়নি। একইভাবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আহ্বান সত্ত্বেও ইরানের জনগণ সরকার উৎখাতে বড় ধরনের আন্দোলনে নামেনি।


ছয় মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটা ক্ষয়যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়েছে। মাঝেমধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা তীব্র হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে তেলবাহী জাহাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা তারই উদাহরণ। পাশাপাশি তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।


বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও এই যুদ্ধ চলতে পারে। যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।


তেলের দাম ও অর্থনৈতিক চাপ

যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট সমাপ্তির পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বাধা দেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে।


যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রকে এমন আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।


হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। তার দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ‘সাহস’ একমাত্র ট্রাম্পই দেখিয়েছেন। তার মতে, ট্রাম্প তার সব লক্ষ্য অর্জন করেছেন এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।


অতীতের শিক্ষা কি উপেক্ষিত?

বিশ্লেষকদের মতে, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি।


২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার হামলায় নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হয়। দুই বছর পর ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে হামলা চালানো হয়। সে সময় দাবি করা হয়েছিল, ইরাক ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরি করছে। পরে সেই তথ্য সঠিক ছিল না বলে প্রমাণিত হয়।


দুই যুদ্ধই মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল করে। দীর্ঘ যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষই একসময় ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম পটভূমি তৈরি করে।


২০২৪ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প সামরিক অভিযানে জড়ানোর বদলে আমেরিকানদের অর্থনৈতিক সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।


তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধের ক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনও ভুল হিসাব করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে।


মিত্রদের নিয়েও প্রশ্ন

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সমর্থন কমে গেলেও শুরুতে মিত্রদের বড় অংশ ওয়াশিংটনের পাশে ছিল।


অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর আগে ট্রাম্প খুব বেশি মিত্র দেশের সঙ্গে আলোচনা করেননি বলে বিশ্লেষকদের দাবি। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহী।


গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন, ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ কমানো এবং বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের মতো বিষয়গুলোও এর আগে মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে।


মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত

ইরাক যুদ্ধের মতোই ইরান যুদ্ধের প্রভাবও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা এমন একটি সংঘাত থেকে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছেন, যা তারা নিজেরা চাননি। একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের প্রকৃত কৌশল কী ছিল।


সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কারণে শুরু হওয়া যুদ্ধ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।


দ্রুত জয়ের আশা থেকে দীর্ঘ অচলাবস্থা

ট্রাম্প শুরুতে আশা করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা ৩ জানুয়ারির অভিযানের মতো দ্রুত ইরানেও জয় পাওয়া যাবে।


কিন্তু বাস্তবে ইরান অভিযান দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাসহ ট্রাম্পের পরিবর্তিত বিভিন্ন লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে গেছে।


তবে সবাই যে ট্রাম্পের ইরান নীতির সমালোচক, তা নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইরানবিরোধী থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের প্রধান মার্ক ডুবোভিৎস মনে করেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ ঠেলে দেননি। তার দাবি, ট্রাম্প এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিজয় আসবে।


তার ভাষায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র গত ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত করেছে।


তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বলছে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুত ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার পথটি এখন ইরান যুদ্ধের কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এর থেকে বেরিয়ে আসবে।


তথ্যসূত্র: রয়টার্স, জাগোনিউজ