বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬

জার্মানিতে ফের উড়ছে নাৎজি আদর্শের ধ্বজা!

সোনার দেশ ডেস্ক ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:৩০ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:৩০ অপরাহ্ন
জার্মানিতে ফের উড়ছে নাৎজি আদর্শের ধ্বজা!

ফের জার্মানিতে নাৎজি পার্টির উত্থান! ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিচ্ছে আডল্‌ফ হিটলারের চিন্তাধারা। তবে এ বার আর ইহুদি বিদ্বেষ নয়। মুসলিম শরণার্থী সমস্যা, বেকারত্ব এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসেছে তারা। চরম দক্ষিণপন্থীদের এ-হেন বাড়বাড়ন্তে আতঙ্কিত পশ্চিম ইউরোপ। অন্য দিকে, এই ঘটনায় মস্কোর মুখে হাসির যে চওড়া হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।


চলতি বছরের ৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট প্রদেশের নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হতেই চোখ কপালে ওঠে সকলের। দেখা যায়, ৪৪.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে অল্টারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচলান্ড বা এএফডি পার্টি। এদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নাৎজ়ি জাতীয়তাবাদের হুবহু মিল রয়েছে। হিটলারকে একরকম গুরু মানেন তাঁরা।


বর্তমানে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে রয়েছেন ফ্রিডরিখ মের্ৎজ। স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে মারাত্মক ভাবে কমেছে তাঁর দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) ভোট শতাংশ। মাত্র ১৮.৫ শতাংশের সমর্থন পেয়েছেন তারা। এর জেরে হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর মধ্য ইউরোপের দেশটির কোনও রাজ্যে নাৎজি মতাদর্শে বিশ্বাসী কট্টর দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতার এত কাছাকাছি চলে এসেছে।


স্যাক্সনি-আনহাল্টের আইনসভায় মোট ৮৩টি আসন রয়েছে। নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘জাদুসংখ্যা’ ৪২-র মধ্যে ৩৯টি যেতে পারে এএফডির দখলে। সে ক্ষেত্রে কুর্সি পেতে আরও তিনটি আসনের প্রয়োজন হবে তাদের। ইতিমধ্যেই সেই সমর্থন আদায়ের জন্য অন্য রাজনৈতিক দলগুলির কাছে আবেদন করেছে তারা।


যদিও স্যাক্সনি-আনহাল্টে সরকার গঠন করা এএফডির পক্ষে একেবারেই সহজ নয়। কারণ, জার্মানির অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধ রয়েছে তাদের। তা ছাড়া, নাৎজ়িবাদে বিশ্বাসী সংশ্লিষ্ট পার্টির কট্টর ডান ‘উগ্রপন্থী’ চিন্তাভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যেই সবাইকে সতর্ক করেছে মধ্য ইউরোপের দেশটির গোয়েন্দাবাহিনী। তাই সহজে কেউ তাদের সঙ্গে জোটে যেতে রাজি হবে না বলে একরকম নিশ্চিত ওয়াকিবহাল মহল।


যদিও এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এএফডিকে সরকার গঠনে সাহায্য করবে ‘বুন্ডনিস সারা ভাগেনকনেখট’ বা বিএসডব্লিউ নামের একটি রাজনৈতিক দল। মতাদর্শগত দিক থেকে তারা বাম-জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। মজার বিষয় হল, নতুন নাৎজ়িদের সঙ্গে জোট বাঁধতে চলা বিএসডব্লিউ-র বয়স মাত্র দু’বছর। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্টির সদর দফতর রয়েছে রাজধানী বার্লিনে।


তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সাম্প্রতিক সময়ে জার্মান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘বুন্দেসটাগ’-এ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে এএফডির জনপ্রতিনিধির সংখ্যা। গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ফেব্রুয়ারিতে হওয়া শেষ নির্বাচনে সেখানকার ৬৩০-এর মধ্যে ১৫২টি আসন দখল করে তারা, শতাংশের নিরিখে যেটা ২৪.১। ফলে বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে হিটলারপন্থী অল্টারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচলান্ড।


এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পার্লামেন্টে এএফডির মোট ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, জার্মান আমজনতার মধ্যে যে ভাবে নাৎজ়ি মতাদর্শের প্রভাব বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে প্রাদেশিক গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্তরেও ক্ষমতা দখল করতে পারে তারা। শুধু তা-ই নয়, ফ্রান্স, স্পেন এবং পোল্যান্ডেও চরম দক্ষিণপন্থার উত্থান দেখতে পাওয়া যাবে বলে সতর্ক করেছে পর্যবেক্ষক মহল।


জার্মানি তথা ইউরোপে নতুন করে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়। বিশেষজ্ঞদের কথায়, এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ, যার অন্যতম হল শরণার্থী সমস্যা। পশ্চিমি দুনিয়া অবশ্য এর নাম দিয়েছে ‘ইউরোপীয় অভিবাসী সঙ্কট’। এর সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালে। পরবর্তী এক দশকে সেটা সংশ্লিষ্ট মহাদেশের বিস্তীর্ণ অংশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরিতে অনুঘটকের কাজ করেছে।


২১ শতকের প্রথম দশক শেষ হওয়ার আগেই ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার মতো পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার একের পর এক দেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় চরম দারিদ্র। ফলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্র। তত দিনে প্রাণ বাঁচাতে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে বিদেশযাত্রার হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে।


এই পরিস্থিতিতে পরিত্রাতার ভূমিকা নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে দরজা খুলে দেয় তারা। ফলে স্রোতের মতো অভিবাসীরা ঢুকতে শুরু করে ইইউ-ভুক্ত রাষ্ট্রগুলিতে। এর অন্যতম হল জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেন। ২০১৫-’১৬ এই এক বছরে ১০ লাখ শরণার্থীকে গ্রহণ করে বার্লিন। এঁদের সিংহভাগই ছিলেন সিরিয়ার নাগরিক। এই চাপে ধীরে ধীরে ফোঁপরা হতে থাকে তাদের অর্থনীতি।


দ্বিতীয়ত, বানের জলের মতো শরণার্থীরা ঢুকে পড়ায় ইউরোপে তৈরি হয়েছে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক জটিলতা। কারণ, এর জেরে খ্রিস্টান প্রধান জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলিতে হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে মুসলিম জনসংখ্যা। পাশাপাশি, যত্রতত্র মসজিদ নির্মাণ এবং শরিয়া আইন চালু করার দাবিও তুলতে দেখা যাচ্ছে অভিবাসীদের। সেটা ‘জার্মান জাত্যাভিমান’কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল।


ব্রিটেনের পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিষয়টা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। পশ্চিম ইউরোপের দ্বীপরাষ্ট্রটির একাধিক জায়গায় শরিয়া আদালত চালাচ্ছে মুসলিম শরণার্থীদের একাংশ। এ ছাড়া শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। একই ভাবে গত কয়েক বছরে প্যারিস-সহ ফ্রান্সের একাধিক শহরে তাণ্ডব চালিয়েছে মরক্কোর অভিবাসীদের একাংশ। এই ঘটনাগুলি যে চরম দক্ষিণপন্থীদের পালে হাওয়া জুগিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।


তৃতীয়ত, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে জার্মানি-সহ ইইউ-ভুক্ত দেশগুলিতে বেড়েছে চিনা নির্ভরশীলতা। ফলে, বর্তমানে বেজিঙের সস্তা পণ্যে ভরে গিয়েছে তাদের বাজার। এর বিরুদ্ধে সরকার কোনও পদক্ষেপ না করায় ক্রমাগত তালা পড়ছে বড় বড় শিল্পসংস্থায়। বাড়ছে ছাঁটাই। এতে মারাত্মক ভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বেকারত্বের হার।


সব শেষে অবশ্যই বলতে হবে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা। এএফডির বক্তব্য, এই যুদ্ধ জার্মানির নয়। আর তাই কিভকে লাগাতার সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করার কোনও মানে নেই। উল্টে ঘরোয়া সমস্যা, যেমন শিল্পায়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং শরণার্থী তাড়ানোর উপর জোর দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে ঝড় তোলে হিটলারপন্থী রাজনৈতিক দলটি। এরই লভ্যাংশ ভোটের বাক্সে তুলেছে তারা, বলছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

জার্মানিকে বাদ দিলে বর্তমানে শরণার্থী-‘উপদ্রবে’ নাকাচি-চোবানি খাচ্ছে ফ্রান্স, স্পেন এবং ব্রিটেনের মতো পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি। এর মধ্যে প্রথম দু’টি দেশে চরম দক্ষিণপন্থীদের তীব্র গতিতে উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে মেরিন লে পেন-এর ‘রাসেম্বলমেন্ট ন্যাশনাল’ বা আরএন দলটির কথা বলা যেতে পারে। এই পার্টি থেকেই পরবর্তী ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।


একই ছবি স্পেনের ক্ষেত্রেও সত্যি। সেখানকার রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থীদের জনপ্রিয়তা বাড়তে বাড়তে ৩২ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। অন্য দিকে, ক্রমশ নামছে ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দলের সূচক। বর্তমানে ২৬ শতাংশ স্পেনবাসীর সমর্থন রয়েছে তাদের দিকে। এ ছাড়া, ১,৪১৩ দিনের বেশি সময় ধরে ইটালিতে ক্ষমতায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। হিটলারের অভিন্নহৃদয় বন্ধু বেনিটো মুসোলিনি তাঁর রাজনৈতিক গুরু।


২০১০ সালে সারা ইউরোপে চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির ভোট শতাংশ ছিল মাত্র ৬.১ শতাংশ। এ বছর সেটাই বেড়ে ২৩.২ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। এর নেপথ্যে আরও একটি কারণ হিসাবে সরকারের স্থায়িত্বকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। উদাহরণ হিসাবে ফ্রান্সের কথা বলা যেতে পারে। সেখানে মাত্র পৌনে দু’বছরের মধ্যে পাঁচ বার প্রধানমন্ত্রী বদল করতে বাধ্য হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। একই ভাবে গত এক দশকে সাত জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে ব্রিটেনও।



বিশেষজ্ঞদের দাবি, আগামী দিনে এএফডি জার্মানির ক্ষমতা দখল করলে কপাল পুড়বে মুসলিম শরণার্থীদের। পাশাপাশি, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ধরতে পারে ভাঙন। কারণ, এই গোষ্ঠীর বহু নীতির প্রকাশ্যে সমালোচনা করে থাকে তারা। একই ভাবে তখন বার্লিনের ক্ষেত্রে সামরিক সাহায্য পাওয়ার আশা পুরোপুরি ছাড়তে হবে ইউক্রেনকে। চিনা নির্ভরশীলতা কমাতে শিল্পায়নে জোর দিতে দেখা যেতে পারে তাদের।


১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দু’বছরের মাথায় জন্ম হয় ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মানি ওয়ার্কাস পার্টি বা নাৎজ়িদের। ১৯৩৩ সালে এই দলেরই নেতা হিসেবে ক্ষমতায় আসেন হিটলার। পরবর্তী বছরগুলিতে জার্মানিকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেন তিনি। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার জেরে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫)। শরণার্থী সমস্যা মেটাতে গিয়ে এএফডি ফের সেই রাস্তায় হাঁটবে না তো? তার উত্তর দেবে সময়।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন