বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

পদ্মার জলধারায় সাপ—আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:১৮ অপরাহ্ন বিশেষ প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:১৮ অপরাহ্ন
পদ্মার জলধারায় সাপ—আতঙ্ক

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসছে রাসেলস ভাইপার, কিং কোবরা, কমনক্রেটসহ বিষধর সাপ। প্রমত্তা পদ্মার পানি রাজশাহী অঞ্চলের আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোর খাল-বিল, নদী-নালা এবং ছড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে বিষধর সাপও ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের খেত, বন-জঙ্গলে।



রাজশাহীর পদ্মায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে নদীর কয়েকটি চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিষধর সাপের আতঙ্ক। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ স্থলভাগের দিকে উঠে আসছে বলে জানিয়েছেন পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা। 


২০০৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে রাসেলস ভাইপার, কোবরাকে বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এবং ও বিশ্বে বিপন্মুক্ত প্রাণীগোত্রভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত করা হলেও গত এক দশকের বেশি সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে আস্তানা গেড়েছে ভয়ংকর এ দুটি সাপ। গত সাত থেকে আট বছরের ব্যবধানে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও বেড়েছে রাসেলস ভাইপার ও কোবরার উপদ্রব।


বাংলাদেশ ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক বোরহান বিশ্বাস রোমন। পবা উপজেলাতে রয়েছে তার স্নেক রেসকিউ অ্যান্ড কনজারভেশন সেন্টার। রাসেলস ভাইপার সম্পর্কে তিনি লেন, ‘আশির দশকে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তর সাপটিকে বিলুপ্ত প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করে। তবে ২০০৯ সালে বাংলাদেশে সাপটির প্রথম দেখা মেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষিজমিতে। ২০১১ ও ২০১২ সালে শুধু রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার দেখা মিললেও ২০১৩ সালে নাটোরের লালপুরে, ২০১৪ সালে পাবনার রূপপুর এবং একই বছরের শেষদিকে ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলায় এ সাপের সন্ধান মেলে। মূলত ২০১৬ সালের দিকে রাসেলস ভাইপারের কামড়ে মৃত্যুর খবর বেশি মিলতে থাকে। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই সংখ্যাটি বাড়তে থাকে; এখন তা আরও বেশি বেড়েছে। 


রাজশাহী নগরের পাঠানপাড়া এলাকার শাহেদ আলম বেশির ভাগ সময় থাকেন নদীতে। তিনি জানান, বছর পাঁচেক আগেও সাপের ভয় লাগত না। কিন্তু এখন লাগে। বিশেষ করে রাতের বেলায়। কারণ গত কয়েক বছরে রাজশাহীর চর, নদীর আশপাশে সাপের আনাগোনা বেড়েছে। তাদের এলাকার অনেক মানুষকেই রাসেলস ভাইপার কামড়েছে। বহু সাপ পিটিয়েও মারা হয়েছে। তার পরও কর্ম যখন নদীতেই তাই সাবধানে চলাচল করতে হয়। আর পানি বৃদ্ধির কারণে সাপের উপদ্রপ আরও বেড়েছে। 


চারঘাট উপজেলার কৃষক আবুল কালাম। পদ্মার মধ্য চরে ছিল তাদের কিছু আবাদি জমি। নদীর পাশেও রয়েছে তাদের কয়েক বিঘা জমি। তিনি বলেন, মধ্য চরে যে জমি ছিল সেখানে আবাদ করা খুব দুষ্কর। রাসেলস ভাইপার আর কোবরা সাপের আখড়া। জমিতে যাওয়া যায় না, সাপের উপদ্রব বেশি। একটা সাপ ৩০-৫০টি করে বাচ্চা দেয়। রাতে জমিতে যাওয়া যায় না। গামবুট পরে খুব সাবধানে জমিতে কাজ করতে হয়।

সাপের কামড়ে আক্রান্তদের ব্যাপারে রামেকের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, এ অঞ্চলে প্রতি বছরই তুলনামূলকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পেলে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সাপে কামড়ানো ব্যক্তিদের আলাদা ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সুস্থও হচ্ছেন। 


সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী অঞ্চলে সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়েছে। রামেকে অ্যান্টিভেনমের সংকটও রয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের সাপে কাটা রোগীরও তথ্য পাওয়া যায়নি।


এ প্রসঙ্গে রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ৫০-১০০ ভায়াল করে অ্যান্টিভেনম দেয়া হয়েছে। সাপের কামড়ে আক্রান্ত কেউ এলেই দ্রুত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।