১০০০ বছর পর পৃথিবী কেমন হবে? গবেষণায় যা দেখা গেল
এক হাজার বছর পর পৃথিবী কেমন হবে এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর কারো কাছেই নেই। ছবি: এআই
যারা সাইন্সফিকশন সিনেমা পছন্দ করেন তাদের কাছে হলিউড হচ্ছে আঁতুড়ঘর। এছাড়া কোরিয়াসহ বিভিন্ন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন হবে তা নিয়ে নানান কাল্পনিক গল্পে সিনেমা নির্মাণ করেছে। সব জায়গায় একটি ব্যাপারে খুব মিল তা হচ্ছে প্রযুক্তি, প্রযুক্তির উন্নতি।
আজ থেকে এক হাজার বছর পর পৃথিবী কেমন হবে এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর কারও কাছেই নেই। তবে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত, সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধরে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কয়েকটি ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন। সেখানে কোথাও মানবসভ্যতা দীর্ঘ সময় স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে চলেছে, আবার কোথাও প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিংবা সম্পদের সংকট ডেকে আনছে সভ্যতার পতন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো ভবিষ্যদ্বাণী নয়; নির্দিষ্ট কিছু অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি কম্পিউটার মডেলের ফলাফল।
১০টি ভিন্ন ভবিষ্যৎ
গবেষণার প্রথম পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার জন্য ১০টি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বা সিনারিও তৈরি করেন। প্রযুক্তি, সম্পদ, পরিবেশ, সমাজ এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন কীভাবে মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিতে পারে, সেটিই ছিল এই কাজের মূল বিষয়।
এই ১০টি পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে-বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং, ওয়াইল্ড ওয়েস্ট, গোল্ডেন এইজ, লিভিং উইথ দ্য ল্যান্ড, ট্রান্সহিউম্যানিজম, সোর্ড অব ড্যামোক্লিসেস, রিস্টোরেশন, ওরোবোরোস, ডেসু এক্স মেশিন এবং আউট অব ইডেন। প্রতিটি মডেলে ভবিষ্যতের পৃথিবীকে আলাদা একটি পথে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছে।
প্রযুক্তি যখন মানুষের উন্নতির হাতিয়ার
‘গোল্ডেন এইজ’ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি মানুষের প্রয়োজন মেটাতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। সম্পদের সংকট তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং সভ্যতা দীর্ঘ সময় স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যায়। পৃথিবী তখনো মানবসভ্যতার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে থাকতে পারে। পাশাপাশি চাঁদ, মঙ্গল বা সৌরজগতের অন্যত্র ছোট বসতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও এই মডেলে বিবেচনা করা হয়েছে। ‘আউট অব ইডেন’ এবং ‘ট্রান্সহিউম্যানিজম’-এর মতো কিছু পরিস্থিতিতেও দীর্ঘ সময় প্রযুক্তিগত কার্যকলাপ বজায় থাকার সম্ভাবনা দেখা গেছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তিই আবার বিপদের কারণ
অন্যদিকে ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং’ মডেলে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হলেও তার অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে মানুষের ওপর নজরদারি। সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারে, যেখানে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এবং সর্বব্যাপী নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
‘সোর্ড অব ড্যামোক্লিসেস’ পরিস্থিতিতে সমস্যা আবার অন্য জায়গায়। এখানে সভ্যতা প্রযুক্তির ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে ব্যবস্থার কোনো বড় অংশে বিপর্যয় ঘটলে তার প্রভাব গোটা সভ্যতার ওপর ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তির উন্নতি থাকলেও অতিরিক্ত নির্ভরতা নিজেই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বারবার ধ্বংস, আবার ঘুরে দাঁড়ানো
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দৃশ্যপটগুলোর একটি ‘ওরোবোরোস’। এই মডেলে সভ্যতা একবার উন্নতির শিখরে পৌঁছে স্থায়ীভাবে এগিয়ে যায় না। বরং সংকটের কারণে পতন ঘটে, পরে অবশিষ্ট প্রযুক্তি ও সম্পদের সাহায্যে আবার পুনরুদ্ধার হয়। এরপর নতুন করে উন্নতি এবং আবার পতন এভাবে একটি চক্র চলতে থাকে।১০০০ বছরের সিমুলেশনে এই পরিস্থিতিতে গড়ে প্রায় দুটি বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। তারপরও প্রযুক্তিগত কার্যকলাপ মোট সময়ের বড় অংশজুড়ে বজায় ছিল।
২,০০০ বার কম্পিউটার সিমুলেশন
২০২৬ সালের গবেষণায় এই ১০টি পরিস্থিতিকে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে এক হাজার বছরের সময়সীমায় পরীক্ষা করা হয়। ব্যবহৃত মডেলটি ছিল হাইব্রিড ডিটারমিনিস্টিক-স্টোকাস্টিক মডেল। অর্থাৎ কিছু বিষয় নির্দিষ্ট নিয়মে পরিবর্তিত হয়েছে, আবার কিছু ঘটনা সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে মডেল করা হয়েছে।
প্রতিটি সিনারিও-এর ২০০টি করে স্বাধীন সিমুলেশন বা কৃত্রিম রূপদান করা হয়। ফলে ১০টি পরিস্থিতি মিলিয়ে মোট ২,০০০টি সিমুলেশন রান করা হয়েছে। মডেলে সম্পদের প্রাথমিক পরিমাণ, সম্পদ শেষ হওয়ার হার, পতনের পর কতটা প্রযুক্তি টিকে থাকবে এবং রিকোভারিতে কত সময় লাগবে এ ধরনের বিভিন্ন প্যারামিটার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যদিও সব মডেলে একই ফল আসেনি
কিছু পরিস্থিতিতে পুরো ১০০০ বছরের মডেল সময়েও বড় পতন দেখা যায়নি। গোল্ডেন এইজ এবং আউট অব ইডেনের মতো মডেলে প্রযুক্তিগত কার্যকলাপ দীর্ঘ সময় বজায় ছিল। ট্রান্সহিউম্যানিজম-এও অধিকাংশ সিমুলেশনে সভ্যতা দীর্ঘস্থায়ী ছিল। সহজ কথায় ট্রান্সহিউম্যানিজম হলো প্রযুক্তির সঙ্গে মানবদেহের মেলবন্ধন ঘটিয়ে মানুষের বুদ্ধিমত্তা, আয়ু এবং শারীরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা এর মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং (নজরদারি) এবং সোর্ড অব ড্যামোক্লেস মডেলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত পতনের ঘটনা দেখা যায়। এসব মডেলে প্রথম পতন গড়ে ২১০ বছরের আগেই ঘটেছে।
১০০০ বছর প্রযুক্তিগতভাবে সক্রিয় থাকা মানে কী?
গবেষণায় ‘ডিউটি সাইকেল’ নামে একটি পরিমাপক ব্যবহার করা হয়েছে। সহজভাবে বললে, এক হাজার বছরের মধ্যে সভ্যতা কতটা সময় প্রযুক্তিগতভাবে সক্রিয় ছিল, সেটিই এখানে বোঝানো হয়। ডিউটি সাইকেল ১ হলে পুরো ১০০০ বছরই প্রযুক্তিগত কার্যকলাপ বজায় থাকবে। ওরোবোরোস মডেলে ডিউটি সাইকেল ছিল প্রায় ০.৮৭। অর্থাৎ বারবার পতন ঘটলেও মোট সময়ের বড় অংশে প্রযুক্তিগত কার্যকলাপ বজায় ছিল। রেস্টোরেশন বা পুনরুদ্ধার করা মডেলে গড়ে প্রায় ৭.৫টি রিকোভারি সাইকেল দেখা যায় এবং ডিউটি সাইকেল’ ছিল প্রায় ০.৫৭। লিভিং উইথ দ্য ল্যান্ড মডেলে এই হার ছিল প্রায় ০.৩৮। তবে এসব সংখ্যা বাস্তব পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। মডেলে বিজ্ঞানীরা যে অনুমান ও প্যারামিটার ব্যবহার করেছেন, ফলাফল মূলত তার ওপর নির্ভরশীল।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জানার সঙ্গে এলিয়েনের সম্পর্ক কোথায়?
এই গবেষণার আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো টেকনোসিগনেচার বা প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার চিহ্ন খোঁজা। পৃথিবীর কোনো উন্নত সভ্যতা মহাকাশ থেকে শনাক্তযোগ্য পরিবর্তন তৈরি করলে অন্য গ্রহের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে শিল্প কার্যক্রমের ফলে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বা কিছু সিএফসি-এর মতো গ্যাসের উপস্থিতি বাড়তে পারে। তাই দূরবর্তী কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এমন অস্বাভাবিক রাসায়নিক সংকেত পাওয়া গেলে সেটি সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে সহজে বললে, ১০০০ বছর পর পৃথিবী ঠিক কেমন হবে, তার উত্তর এই গবেষণা দেয় না। বরং এটি দেখায় প্রযুক্তি, সম্পদ, পরিবেশ ও শাসনব্যবস্থা কীভাবে বদলালে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে যেতে পারে।
ক্যাশলেস বাংলাদেশ: মানুষ কতটা প্রস্তুত?
এক হাজার বছরের ভবিষ্যৎ তাই একটিমাত্র গল্প নয়; বরং অসংখ্য সম্ভাবনার সমষ্টি। তাই ১ হাজার বছর পর পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব থাকবে কি না তা নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু পৃথিবী কেমন চলবে তার একটা প্রেডিকশন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
আপনি যদি ডিস্টোপিয়ান সাইন্স ফিকশন অ্যাকশন সিনেমার ভক্ত হয়ে থাকেন তাহলে কিছু সিনেমার নাম আপনার জন্য, চাইলে দেখে নিতে পারেন। এলিসিয়াম, ইন্টারস্টেলার, দ্য ম্যাট্রিক্স, আফটার আর্থ, জাং-ই, স্নোপিয়ার্সার, ওকজা, স্পেস সুইপারস ইত্যাদি। এগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয়, সভ্যতার পতন, প্রযুক্তি এবং মানুষের টিকে থাকার প্রশ্ন সরাসরি উঠে এসেছে। ওকজা সিনেমায় দেখানো হয় জেনেটিক প্রযুক্তি, পরিবেশ, প্রাণী এবং বৃহৎ করপোরেশনের প্রভাব নিয়ে তৈরি। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর চেয়ে প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সম্পর্ক এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: ইয়াহু, এনডিটিভি, জাগোনিউজ