বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

মহাকাশে জ্বালানি ভরে মৃতপ্রায় উপগ্রহকে চাঙ্গা করে ফেলল চিন! কেন ‘গোটাটাই ভাঁওতা’ বলছে আমেরিকা?

সোনার দেশ ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ন
মহাকাশে জ্বালানি ভরে মৃতপ্রায় উপগ্রহকে চাঙ্গা করে ফেলল চিন! কেন ‘গোটাটাই ভাঁওতা’ বলছে আমেরিকা?

মহাকাশের লড়াইয়ে নতুন যুগের সূচনা! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে পিছনে ফেলে ‘উড়ছে’ চিন। শুধু তা-ই নয়, অন্তরীক্ষে ভ্রাম্যমান কৃত্রিম উপগ্রহে জ্বালানি ভরার দাবি করে হইচই ফেলে দিয়েছেন বেজিঙের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বিগত কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করেও এই বিষয়ে সাফল্য পায়নি আমেরিকা। ফলে, মান্দারিনভাষীদের কীর্তিতে বেজায় অস্বস্তিতে ওয়াশিংটন। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সন্দেহ প্রকাশ করে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে তারা।


চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মহাকাশভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে হংকঙের ইংরেজি দৈনিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। চিনের সরকারি সংস্থা ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন এবং চাইনিজ় অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর গবেষকদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, একটি দিক নির্ণয়কারী উপগ্রহে জ্বালানি ভরার যুগান্তকারী অভিযানে সাফল্য পেয়েছে বেজিং। ফলে, ওই মহাকাশযানের জীবনীশক্তি বেড়ে গিয়েছে অন্তত আট বছর।


চিনের দিকনির্ণয়কারী ওই কৃত্রিম উপগ্রহের পোশাকি নাম ‘বেইডু ২ জি-৭’। এতে জ্বালানি ভরতে ‘শিজিয়ান-২৫’ নামের একটি মহাকাশযান অন্তরীক্ষে পাঠায় বেজিং। গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ফেব্রুয়ারিতে এর সাহায্যে ‘বেইডু ২’-এ ১৪২ কেজির প্রোপেল্যান্ট প্রতিস্থাপনে সক্ষম হন মান্দারিনভাষী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

পৃথিবীর নিম্নকক্ষে থাকা সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই ‘শিজিয়ান-২৫’ বানিয়েছে ড্রাগন।

দুনিয়ার তাবড় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নির্মিত কৃত্রিম উপগ্রহের গড় বয়স পাঁচ থেকে ১৫ বছর হয়ে থাকে। সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি নিয়ে মহাশূন্যে যাত্রা করে ওই সমস্ত মানববিহীন যান। অন্তরীক্ষে পৌঁছে নির্ধারিত কক্ষপথে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে সেগুলি। ওই সময় তীব্র গতির কারণে মাঝেমধ্যেই রাস্তা হারিয়ে ফেলে কৃত্রিম উপগ্রহ। তখনই তাদের কক্ষপথে ফেরাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন পড়ে জ্বালানির।


অন্তরীক্ষে মাধ্যাকর্ষণ বল শূন্য হওয়ায় সাধারণ ভাবে বিনা জ্বালানিতেই পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারে কৃত্রিম উপগ্রহ। ওই সময় ইঞ্জিনও চালু থাকে না তার। কিন্তু, নানা কারণে প্রায়ই কক্ষচ্যুত হয়ে যায় ওই যান। তা ছাড়া, গতির কারণে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা পরিস্থিতির মুখেও পড়ে তারা। সেটা এড়াতে তখন তড়িঘড়ি চালু করা হয় ইঞ্জিন। এর সাহায্যে অন্তরীক্ষে রাস্তা পাল্টে ফের নিজের কক্ষপথে ফিরে আসে ওই কৃত্রিম উপগ্রহ।


তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মহাকাশে ইঞ্জিন চালু করা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানির। সেটা শেষ হয়ে গেলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সংশ্লিষ্ট উপগ্রহকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করে থাকেন। কিন্তু, এই পদ্ধতিতে দেখা দেয় অন্য সমস্যা। গত কয়েক বছরে অন্তরীক্ষে মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ‘অকেজো’ কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা। সেই জঞ্জাল পরিষ্কার করতে গিয়ে ঘুম ছুটছে বিশ্বের তাবড় গবেষক সংস্থার।


আর তাই সমস্যা সমাধানে বর্তমানে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরিতে জোর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একাংশ। এই কাজে চিন এক ধাপ এগিয়ে গেল বলেই মনে করা হচ্ছে। লম্বা দূরত্ব পেরিয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনার সময় মাঝ-আকাশে জ্বালানি ভরে যুদ্ধবিমান। সেই একই পদ্ধতিতে মহাশূন্যে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে অপরটিতে তাদের গবেষকেরা তেল পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছে বেজিং।

চিনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দাবি, জ্বালানি ভরার জন্য দিকনির্ণয়কারী ‘বেইডু ২’ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ‘শিজিয়ান-২৫’-এর গতিবেগ হ্রাস করেন তাঁরা। জ্বালানি প্রতিস্থাপনের সময় সেকেন্ড ৩৩১.৪৩ মিটার গতিতে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছিল তারা। একটি সুপার কম্পিউটারের সাহায্যে নিখুঁত ভাবে এই হিসাব কষা হয় বলে জানিয়েছে বেজিং। ‘বেইডু’র জীবনীশক্তি বাড়াতে গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে শিজিয়ানকে অন্তরীক্ষে পাঠায় ড্রাগন।

যদিও চিনের এই দাবি পুরোপুরি ভাবে খারিজ করেছে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে পৃথিবীর কক্ষপথে ১২০ ডিগ্রিতে ছিল শিজিয়ান-২৫। জুন আসতে আসতে সেটা ১২৭ ডিগ্রি হয়ে যায়। অন্য দিকে, ১১০ ডিগ্রিতে ঘুরছে বেইডু ২। জ্বালানি ভরার জন্য সেটিকে কক্ষপথ বদল করতে দেখা যায়নি। দু’টি বস্তু দু’জায়গায় থাকলে কী ভাবে জ্বালানি প্রতিস্থাপন করল বেজিং?

যুক্তরাষ্ট্রের তোলা এই প্রশ্নে অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নয় চিন। বেজিঙের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২১ সালে দু’টি কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হন তাঁরা। তবে, সে বার অন্তরীক্ষে জ্বালানি প্রতিস্থাপন করা হয়নি। পাশাপাশি, প্রমাণ হিসাবে ছবি দিতে অস্বীকার করেন তাঁরা। আমেরিকাকে বাদ দিলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির দৌড়ে রয়েছে রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাপান। যদিও কেউই চূড়ান্ত সাফল্য পায়নি।

বিশেষজ্ঞদের কথায়, গত কয়েক বছরে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে মহাকাশের প্রতিযোগিতা। উদাহরণ হিসাবে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের কথা বলা যেতে পারে। দু’টি দেশের কাছেই রয়েছে ওই প্রযুক্তি। ফলে, একই রকেটে বার বার অন্তরীক্ষে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হচ্ছে তারা। এতে অনেকটাই কমেছে ব্যোমযাত্রার খরচ। বর্তমানে এই ধরনের রকেট নির্মাণের কাছাকাছি পৌঁছেছে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সংস্থা ইসরো।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, অন্তরীক্ষের দৌড়ে পিছন থেকে উঠে এসে কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকাকে ছাপিয়ে গিয়েছে চিন। যুক্তি হিসাবে ২০১১ সালে পৃথিবীর নিম্নকক্ষে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে বেজিঙের সাফল্যকে তুলে ধরেছেন তাঁরা। এর পোশাকি নাম ‘তিয়ানগং-১’ বা স্বর্গীয় প্রসাদ। অন্য দিকে, এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ একক দক্ষতায় এই ধরনের কোনও নভোযান তৈরি করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও এর পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মহাকাশে হাতিয়ার মোতায়েনের কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করে আমেরিকা। এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে দেওয়া বক্তৃতায় প্রথম বার এই তথ্য দেন মার্কিন বায়ুসেনা সচিব ট্রয় মেইঙ্ক। সেখানে ‘অন-অরবিট’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। তবে অন্তরীক্ষে পাঠানো অস্ত্রটি কী ধরনের, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের এই সাফল্যের ধারেকাছে নেই চিন।

আমেরিকার ওই ঘোষণার পর মুখ খোলে বেজিং। মহাকাশে ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’য় না নামতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগনকে অনুরোধ করে তারা। এ প্রসঙ্গে সংবাদসংস্থা এএফপিকে চিনা বিদেশ মন্ত্রকের এক মুখপাত্র বলেন, ‘‘আমরা চাই অন্তরীক্ষে যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করুক আমেরিকা।’’ ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক আইনে অবশ্য মহাশূন্যে বিধ্বংসী হাতিয়ার মোতায়েনে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

এ-হেন পরিস্থিতিতে মহাকাশে পাঠানো মার্কিন হাতিয়ারটি নিয়ে দুনিয়া জুড়ে বাড়ছে জল্পনা। বিশ্লেষকদের অনুমান, আক্রমণ বা আত্মরক্ষা, দু’ধরনের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার হতে পারে ওই অস্ত্র। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট-এর গবেষক ব্লেডিন বোয়েনের অনুমান, অন্তরীক্ষে ‘রেডিয়ো জ্যামিং প্ল্যাটফর্ম’ (রেডিয়ো যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করার যন্ত্র) স্থাপন করেছে আমেরিকা, যেটা শত্রুর কৃত্রিম উপগ্রহের বার্তাকে বিঘ্নিত করবে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একাংশের আবার ধারণা, মহাকাশে ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত বিশেষ একটি যান পাঠিয়েছে আমেরিকা। সেটা দিয়ে যখন-তখন শত্রুর কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সে ক্ষেত্রে অন্তরীক্ষে জমা হবে বিপুল জঞ্জাল। ফলে, শেষ পর্যন্ত সেই ঝুঁকি ২০১৯ সালে জন্ম নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবাহিনী নেবে কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। তবে, অস্ত্র মোতায়েন করে চিন ও রাশিয়াকে যে তারা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

২০২২ সালে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মহাকাশ সংঘাতের আশঙ্কা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, লড়াইয়ের গোড়া থেকেই বেশ কিছু ইউরোপীয় উপগ্রহের উপর ‘গোয়েন্দাগিরি’ চালাতে থাকে মস্কোর দু’টি নভোযান। আমেরিকার অভিযোগ, অন্যান্য উপগ্রহকে নিশানা করতে সক্ষম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে ক্রেমলিন। যদিও এই নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি রাশিয়া।

মার্কিন মহাকাশবাহিনী মনে করে, ফৌজি আধুনিকীকরণের নামে অন্তরীক্ষের শক্তি বৃদ্ধি করছে চিন। এই সংক্রান্ত একাধিক প্রবন্ধ রয়েছে তাদের ওয়েবসাইটে। তা ছাড়া, রাশিয়া মহাশূন্যকে একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখছে বলেও সতর্ক করেছে তারা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সংঘাতে অন্তরীক্ষ যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর তাই বেজিঙের করা কৃত্রিম উপগ্রহের জীবনীশক্তি বৃদ্ধির দাবিও ফেলে দেওয়ার নয়।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন