বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

পৃথিবীতে দিন ছিল ১০ ঘণ্টার, চাঁদের দাপটে এত দিনে তা ৬০ ঘণ্টাও হয়ে যেতে পারত! ঠেকিয়ে রেখেছে সূর্যই

সোনার দেশ ডেস্ক ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩১ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩১ অপরাহ্ন
পৃথিবীতে দিন ছিল ১০ ঘণ্টার, চাঁদের দাপটে এত দিনে তা ৬০ ঘণ্টাও হয়ে যেতে পারত! ঠেকিয়ে রেখেছে সূর্যই

নিজের অক্ষের চারপাশে ২৪ ঘণ্টায় এক বার পাক খায় পৃথিবী। দিন-রাতের খেলায় এই হিসাব জলের মতো স্পষ্ট। কিন্তু বরাবরই কি তা ছিল? বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য অতীতে আরও অনেক কম ছিল। ধীরে ধীরে তা বেড়ে চলেছে। আগামী দিনে আরও বাড়বে। তার নেপথ্যে রয়েছে পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ!


বিজ্ঞানীরা আগেই গবেষণা করে দেখেছিলেন, চাঁদের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ধীরে ধীরে কমছে। তার ফলে একটু একটু করে বাড়ছে দিনের দৈর্ঘ্য। বর্তমান হিসেব অনুযায়ী, প্রতি ১০০ বছরে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য ১.৭ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে চাঁদ যখন প্রথম তৈরি হয়েছিল, পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য ছিল ১০ ঘণ্টারও কম! তার পর থেকে আমাদের গ্রহের উপর উপগ্রহটির মহাকর্ষীয় টানের প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে। কমেছে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি। ফলে দিন ক্রমে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।


চাঁদের প্রভাবে পৃথিবীতে যে হারে লম্বা হচ্ছে দিন, তাতে এত দিনে তার দৈর্ঘ্য ৬০ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যেতে পারত। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী সম্প্রতি গবেষণা করে দেখিয়েছেন, এর নেপথ্যে সূর্যের হাত রয়েছে। অর্থাৎ, কোটি কোটি বছর ধরে সূর্যই চাঁদকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। তাই পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু চাঁদ নয়, সূর্যের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণাটি সম্প্রতি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর থিয়োরিটিক্যাল অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (সিআইটিএ)-এর বিজ্ঞানী নরম্যান মারে।


চাঁদের টানে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, পৃথিবীর মহাসাগরগুলির জল বেড়ে যায় চাঁদের মহাকর্ষীয় টানের প্রভাবে। তা জলে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির বিপরীতমুখী একটি স্ফীতি তৈরি করে। এই সময় উথালপাথাল জলের সঙ্গে সমুদ্রতলের ঘর্ষণ পৃথিবীর গতিতে ‘ব্রেকের মতো’ কাজ করে। কিন্তু জোয়ার শুধু চাঁদের নয়, সূর্যের কারণেও হয়ে থাকে, দাবি কানাডার বিজ্ঞানীদের। সেই জোয়ারে আবার বিপরীত ঘটনা ঘটে। বেড়ে যায় পৃথিবীর গতি! চাঁদ যদি ‘ব্রেক’ হয়, সূর্য তবে ‘অ্যাক্সিলারেটর’।


বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, সূর্যের প্রভাবে জলে নয়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে একপ্রকার স্ফীতি তৈরি হয়। জলের পরিবর্তে


বায়ু ফুলে ওঠায় তা গ্রহের ঘূর্ণন গতি বাড়িয়ে দেয়। মারে জানিয়েছেন, সূর্যের মহাকর্ষ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে আকর্ষণ করে। কিন্তু চাঁদ ও সূর্যের দড়ি টানাটানিতে কোনও ভারসাম্য নেই। কারণ, চাঁদ আমাদের অনেক কাছে। তার টান সূর্যের চেয়ে বেশি। চাঁদের জোয়ারের চেয়ে সূর্যের জোয়ারের প্রভাব প্রায় দশ গুণ কম। সেই কারণেই দিন দিন পৃথিবীর গতি কমছে, বাড়ছে না।


বিজ্ঞানীদের দাবি, আজ থেকে প্রায় ২০০ কোটি বছর আগে অন্যরকম ঘটনা ঘটেছিল। পৃথিবীর উপর সূর্য


এবং চাঁদের আকর্ষণে একপ্রকার ভারসাম্য চলে এসেছিল। তা স্থায়ী ছিল কোটি কোটি বছর। তখন পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য ছিল ১৯.৫ ঘণ্টা। দীর্ঘ সময় দিনের এই দৈর্ঘ্যে কোনও পরিবর্তন হয়নি। সেই কারণেই এখন পৃথিবীতে দিন হয় ২৪ ঘণ্টায়। কয়েক কোটি বছরের ওই স্থিতাবস্থা না এলে এত দিনে হয়তো ৬০ ঘণ্টার দিনের সাক্ষী থাকত আমাদের গ্রহ।


গবেষণায় দাবি, ২০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যের মহাকর্ষের প্রভাব অনেক বেশি ছিল। বায়ুমণ্ডল তখন ছিল আরও উষ্ণ। যে কম্পাঙ্কে তার মধ্যে দিয়ে তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, তা দিনের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বায়ুমণ্ডলের কম্পাঙ্ক অনেকটাই নির্ভর করে তার তাপমাত্রার উপর। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে অধিকাংশ সময়েই বায়ুমণ্ডলের এই কম্পাঙ্কের সঙ্গে গ্রহের ঘূর্ণন গতির সামঞ্জস্য থাকে না। বর্তমানেও নেই। এখন দু’টি বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গের মধ্যেকার ব্যবধান ২২.৮ ঘণ্টা প্রায়, যা দিনের দৈর্ঘ্যের চেয়ে কম। কিন্তু ২০০ কোটি বছর আগেকার যে সময়টি নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তখন একটি অভিনব ঘটনা ঘটেছিল। পৃথিবীর উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে দুই তরঙ্গের ব্যবধান ছিল ১০ ঘণ্টা মাত্র। চাঁদের প্রভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমে দিনের দৈর্ঘ্য তখন পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় ২০ ঘণ্টায়। এই দুইয়ের মধ্যে অনুপাত সমান হয়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলীয় জোয়ার আরও জোরদার হয়ে ওঠে। সূর্যের মহাকর্ষ এতই প্রবল হয় যে, তা চাঁদকে টেক্কা দিতে শুরু করে। সমুদ্রে চাঁদের জোয়ারের প্রভাবকে প্রতিহত করে বায়ুমণ্ডলে সূর্যের জোয়ার। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য ১৯.৫ ঘণ্টায় স্থির ছিল। না কমেছে, না বেড়েছে।


এখন বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা ফের বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এর ফলে ফের পৃথিবীতে জোয়ারের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। মারে বলেন, ‘‘পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, বায়ুমণ্ডলের কম্পাঙ্কও উচ্চতর হচ্ছে। সূর্যের প্রভাব কমায় স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত পৃথিবীতে বাড়ছে দিনের দৈর্ঘ্য।’’ আগামী দিনে ফের কোনও স্থিতাবস্থা তৈরি না হলে কয়েকশো কোটি বছরের মধ্যে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি অনেক কমে আসবে। ‘মন্থর’ পৃথিবীতে দিন হবে আরও লম্বা। তবে তত দিন এই গ্রহে মানুষ থাকবে কি না, এখানকার জলবায়ু বাসযোগ্য থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন