চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে আম চাষের পরিসর, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান
গ্রীষ্মের আমের মৌসুম শেষ। তবু চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট ও গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়া আমবাজারে কমেনি বেচাকেনার ব্যস্ততা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারে সারি সারি ভ্যানে বিক্রি হচ্ছে পাকা ও কাঁচা-পাকা আম। বাগান থেকে আম নিয়ে আসছেন চাষিরা, দরদাম করছেন পাইকারেরা। আম কিনছেন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তারাও। মৌসুমি আমের সময় পেরিয়ে বাজারের এই প্রাণচাঞ্চল্যের নেপথ্যে রয়েছে বারোমাসি কাটিমন, বারি আম-২০, কল্যাণভোগসহ বিভিন্ন নাবি জাতের আম।
শত বছরের আমের ঐতিহ্যে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসব জাতের চাষ বাড়ায় উৎপাদন ও বিপণনের সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আম সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ঘিরে বাড়ছে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। মৌসুমি আমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বছরজুড়ে উৎপাদন ও বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন জেলার একাংশের চাষি ও ব্যবসায়ী।
রোববার (১১ অক্টোবর) ঐতিহ্যবাহী কানসাট আমবাজারে কথা হয় আম ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, গোমস্তাপুর উপজেলার বরেন্দ্র এলাকায় তাঁর ১০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের বাগান রয়েছে। এবার ফলন ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে বাগানের প্রায় অর্ধেক আম বিক্রি করেছেন। আরও প্রায় তিন সপ্তাহ আম বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
শরিফুল ইসলাম বলেন, শুরুতে প্রতি মণ কাটিমন আম সাত হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ১০ হাজার টাকায় উঠেছে। মৌসুমের প্রচলিত সময় শেষ হওয়ার পরও আম বিক্রির সুযোগ থাকায় তিনি আশাবাদী।
গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের মেডিকেল মোড়ে গড়ে ওঠা বারোমাসি আমের বাজারটি এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। আমচাষি মনিমুল হক জানান, প্রায় তিন বছর আগে বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের সাত-আটটি উপজেলার চাষিরা এখানে আম নিয়ে আসেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বাজারটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার আম কেনাবেচা হয়।
গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা এলাকার কৃষক ওলিউল ইসলাম নিজের বাগানের আম নিয়ে এসেছিলেন এই বাজারে। তিনি জানান, কয়েক বছর প্রচলিত মৌসুমি আম চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। পরে পুরোনো আমগাছ কেটে কাটিমন আমের চাষ শুরু করেন। কয়েক বছর ধরে বোয়ালিয়া বাজারে আম বিক্রি করছেন তিনি।
কানসাট আমবাজারের ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে আসায় কাটিমন আমের দাম অনেক সময় প্রচলিত মৌসুমি আমের তুলনায় বেশি থাকে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে কাটিমন আম প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে প্রতি মণের দাম উঠছে আট থেকে নয় হাজার টাকা।
কাটিমন আমের বাজার এখন স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। রবিউল ইসলাম জানান, ঢাকার ফলের দোকান, ফুটপাত, ভ্যান ও পাড়া-মহল্লার বাজারে অন্যান্য ফলের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে কাটিমন আম। ফেসবুক ও ইউটিউবকেন্দ্রিক ব্যবসার মাধ্যমেও সরাসরি ক্রেতার কাছে আম পাঠাচ্ছেন চাষি ও ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ।
শিবগঞ্জের আমচাষি আহসান হাবিব বলেন, জেলার চাষি ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এখন নিজেদের বাগানের আম বিক্রির পাশাপাশি অন্য কৃষকের বাগান থেকেও আম সংগ্রহ করছেন। পরে সেসব আম রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
আমের আড়তদার নাইম হোসেন জানান, তিনি প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ টাকার আম কেনেন। পরে এসব আম মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। তাঁর মতে, বারোমাসি আমের উৎপাদন বাড়লে দেশের বাইরেও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমের মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের সময় বাড়ানো গেলে কৃষকের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি ভোক্তারাও বছরের বিভিন্ন সময়ে মানসম্মত আম কেনার সুযোগ পাবেন।
সব মিলিয়ে, বারোমাসি আমের বিস্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। প্রচলিত মৌসুম শেষ হলেও বাগানে ফলন ও বাজারে বেচাকেনা অব্যাহত থাকায় কৃষি ও বিপণনব্যবস্থায় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে উৎপাদনের মান নিশ্চিত করা, বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং রপ্তানির উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।