বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

১০ চিকিৎসক সামলাচ্ছেন ৩০০ রোগীর চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০৬ অপরাহ্ন
১০ চিকিৎসক সামলাচ্ছেন ৩০০ রোগীর চাপ
রাজশাহী বক্ষব্যাধি হাসপাতাল

পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রের সংকট, ওষুধের ঘাটতি ও পুরোনো অবকাঠামো মিলিয়ে নানা সংকটে চলছে রাজশাহীর ১৫০ শয্যার বক্ষব্যাধি হাসপাতাল।  প্রতিদিন ২৫০-৩০০ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে মাত্র ১০ চিকিৎসককে। কিন্তু সেবার পরিধি বাড়লেও প্রতিষ্ঠার সময় নির্ধারিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিৎসকের পদসংখ্যা আর বাড়েনি। ফলে চিকিৎসক থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, টেকনোলজিস্ট ও ওষুধ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা নিয়ে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম।


১৯৬৬ সালে যক্ষ্মার চিকিৎসা দিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি সময়ের সঙ্গে বক্ষব্যাধি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে যক্ষ্মার পাশাপাশি অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি ও শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।


হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১০টি। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিৎসকদের কয়েকজন প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করছেন। ফলে সরাসরি রোগী দেখা ও জরুরি সেবা পরিচালনায় মেডিকেল অফিসারদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।


চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের বড় সমস্যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু আধুনিক যন্ত্র নেই। আবার থাকা কয়েকটি যন্ত্রেও ত্রুটি রয়েছে। বিশেষ করে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।


শুধু জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নয়, হাসপাতালের অবকাঠামোতেও রয়েছে নানা সমস্যা। ২৭ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৬৬ সালে। দীর্ঘদিনের পুরোনো ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও ছাদে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটছে। কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও বিভিন্ন স্থানে আবারও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। দরজা-জানালার ভাঙাচোরা অবস্থা এবং কিছু জায়গায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও চোখে পড়ে।


যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহেও রয়েছে ঘাটতি। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে প্রায় ৪৮ ধরনের ওষুধ সরবরাহের তালিকা থাকলেও রোগীদের নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধ। প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ কিনতে রোগীদের হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসিতে যেতে হচ্ছে।


এদিকে কারিগরি জনবলও প্রয়োজনের তুলনায় কম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিতে একজন এবং এক্স-রে বিভাগে একজন টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। টেকনোলজিস্টের পদ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।  


হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগীদের অভিজ্ঞতায়ও উঠে এসেছে নানা সীমাবদ্ধতার কথা। নগরীর বাসিন্দা ফাতেমা খানম বলেন, হাসপাতালটি বড় হলেও চিকিৎসক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল দেখতে অনেক বড়—কিন্তু ডাক্তারের সংখ্যা খুব কম। এছাড়াও এখানে সব ধরনের পরীক্ষা করা যায় না এবং বাইরে থেকে আমাদের ওষুধ কিনতে হয়।


কাশিয়াডাঙ্গার বাসিন্দা কুদ্দুস আলী কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন, রাত ১২টার দিকে আমার মুখ দিয়ে একবার তাজা রক্ত বের হয়েছিল। এরপর প্রায় ছয়-সাত দিন হলো হাসপাতালে ভর্তি আছি। এখন মোটামুটিভাবে ভালো আছি। তবে মাঝে মাঝে মাজায় সামান্য ব্যথা অনুভব হয়।


হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আউটডোর, ইনডোর ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু রাখা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন।


হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মোহা. মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের হাসপাতাল ভবনটি ১৯৬৬ সালের। পুরোনো হওয়ায় কিছু কিছু জায়গায়, বিশেষ করে কয়েকটি ওয়ার্ডে পলেস্তারা খসে পড়ার সমস্যা রয়েছে। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো সংস্কার করেছি।


তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আরও দু-একটি জায়গায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে। তারা দু-চার দিনের মধ্যে সেগুলো সংস্কার করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে হাসপাতালের জন্য নতুন একটি মেডিকেল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।


তিনি বলেন, আমাদের এখানে তিন ধরনের সেবা চালু আছে—আউটডোর, ইনডোর এবং ইমার্জেন্সি। মূলত রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। এছাড়া রংপুর বিভাগ এবং খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগী আসে।


চিকিৎসকদের ওপর চাপের বিষয়ে তিনি বলেন, ইনডোর, আউটডোর ও ইমার্জেন্সি—তিন ধরনের সেবা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে ১০ জন চিকিৎসক দিয়েই এসব সেবা পরিচালনা করছি।


ডা. মোহা. মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের ল্যাবরেটরিতে একজন টেকনোলজিস্ট, এক্স-রেতে একজন টেকনোলজিস্ট এবং তিনজন ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। সব মিলিয়ে টেকনোলজিস্টের পদ আরও বাড়িয়ে পাঁচটি করা হলে ভালো হতো।


তিনি বলেন, এখানে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যানালজেসিক বা ব্যথানাশকসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।