চলনবিলে পাখি শিকার
কেনাবেচা দুটিই বন্ধ করতে হবে
শীত এলেই চলনবিল হয়ে ওঠে অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়েই যদি পাতা হয় ফাঁদ, ব্যবহার করা হয় জীবন্ত পাখিকে টোপ হিসেবে, আর জালে আটকে বিক্রি করা হয় অতিথিদের—তাহলে তা শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধ। চলনবিল, হালতিবিল ও আশপাশের চরাঞ্চলে পাখি শিকারের যে গোপন কারবারের খবর সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, শিকারিরা পাখির স্বাভাবিক আচরণকেই ফাঁদের অস্ত্র বানাচ্ছে। একটি পাখিকে বেঁধে রেখে তার ডাক শুনে অন্য পাখিদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এরপর জালে আটকে পড়ছে একের পর এক পাখি। কোথাও আবার বিষটোপ ও এয়ারগান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। শিকার করা পাখি যখন বাজারে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়, তখন স্পষ্ট—এর পেছনে নিছক শখ নয়, একটি লাভজনক অবৈধ বাণিজ্যও সক্রিয়।
পাখি নিধনের ক্ষতি শুধু পাখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে, বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বিস্তারে ভূমিকা রাখে এবং জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। ফলে পাখির সংখ্যা কমতে থাকলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক পরিবেশে। চলনবিলের মতো বিশাল জলাভূমির এ ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে।
প্রশাসনের অভিযান ও কয়েকজন শিকারিকে সাজা দেওয়ার ঘটনা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই চক্র বন্ধ করা যাবে না। পাখির আবাসস্থলে নিয়মিত নজরদারি, শিকারি ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বাজারে পাখি বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, বন বিভাগ, পরিবেশ সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, পাখি শিকারি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সেই ক্রেতাও, যার চাহিদা এই অবৈধ বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখে। তাই পাখি কেনা-বেচা দুটিই বন্ধ করতে হবে। চলনবিলের আকাশ যেন শিকারির ফাঁদে নয়, পাখির ডানায় মুখর থাকে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।